ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক অভিঘাতে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) এক অনিশ্চিত যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতির মধ্যেই জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মতে, চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে ‘ত্রিমুখী ধাক্কা’ বা ‘ট্রিপল শক’-এর মুখোমুখি হয়েছে। এই সংকটের তিনটি প্রধান উপাদান হলো—জ্বালানি সংকট, খাদ্য সংকট এবং মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সাংবাদিক রিচার্ড পারটিংটন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী দীর্ঘদিনের উন্নয়নমূলক অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর প্রভাব হবে সবচেয়ে বেশি এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমান সংঘাতের কারণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইউএনডিপি-র প্রশাসক এবং বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডি ক্রু বলেন, “এই ধরনের যুদ্ধ উন্নয়নকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়।” তিনি আরও বলেন, “যদি এখনই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে কার্যকর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবুও এর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে সমাজ ও অর্থনীতিতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেহরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পক্ষ থেকে হরমোজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সার উৎপাদন, শিল্পখাত এবং বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সারের ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে, যা একটি ‘খাদ্য নিরাপত্তা টাইমবোম’-এ রূপ নিতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দ্রুত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি, ঋণ সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপে রয়েছে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো মনে করছে, শুধুমাত্র যুদ্ধবিরতি এই সংকটের সমাধান নয়। বরং দারিদ্র্য বিমোচনে সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় গত এক দশকে অতি দারিদ্র্য কমানোর যে অগ্রগতি হয়েছে, তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান