হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সামরিক ও নৌ অবরোধ, চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট এবং রাশিয়ার বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের ঘোষণা—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে এক জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশলগত পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত এই পদক্ষেপ এক ধরনের ‘জুয়া’, যা সফল হলে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি প্রবাহে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, কিন্তু ব্যর্থ হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ভয়াবহ চাপে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের প্রধান বন্দরগুলোতে বর্তমানে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ প্রবেশ বা বহির্গমন করতে পারছে না। গত সোমবার থেকে কার্যকর হওয়া এই অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে রয়েছে। বিশাল এই অভিযানে ১৫টি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি সুপার ক্যারিয়ার এবং ১১টি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার রয়েছে। পাশাপাশি কয়েক ডজন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ১০ হাজারেরও বেশি মার্কিন মেরিন ও এয়ারম্যান অংশ নিচ্ছে এই মিশনে।
সেন্টকম আরও জানিয়েছে, এ পর্যন্ত অন্তত ছয়টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এবং সেগুলোকে মার্কিন নির্দেশ অনুযায়ী গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে। যদিও গত মঙ্গলবার একটি জাহাজ অবরোধ এড়িয়ে গেছে বলে কিছু গণমাধ্যমে গুঞ্জন ছড়ায়, তবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, সেটি এখনও হরমুজ প্রণালির ভেতরে আটকে রয়েছে এবং নজরদারির মধ্যে আছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২৫ শতাংশ এই ২১ মাইল প্রশস্ত জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ফলে এই প্রণালি আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু তেলের দাম নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
চীন বর্তমানে ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা দেশগুলোর একটি। বেইজিংয়ের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পূরণ হয় ইরানি তেল থেকে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এই অবরোধের ফলে চীন আর ইরানি তেল আমদানি করতে পারবে না। এতে চীন একদিকে জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশলগত ভারসাম্য নিয়েও জটিল অবস্থায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই রাশিয়া নতুন কৌশলগত বার্তা দিয়েছে। চীনের বেইজিংয়ে সফররত রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর জানিয়েছেন, রাশিয়া চীনের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে সক্ষম। তিনি বলেন, রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক যেকোনো বৈশ্বিক চাপ বা সংকটের মধ্যেও স্থিতিশীল থাকবে এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বিশ্বকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই ঘোষণা শুধুমাত্র কূটনৈতিক বার্তা নয়, বরং এটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কৌশলের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। এতে চীনের বাজারে রাশিয়ার প্রভাব আরও বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ওয়াশিংটনের চাপ প্রয়োগের কার্যকারিতা দুর্বল করে দিতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের মূল উদ্দেশ্য শুধু ইরানকে চাপের মুখে ফেলা নয়, বরং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ ‘এনার্জি চোকপয়েন্ট’-এ পুনরায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। যদি এই পরিকল্পনা সফল হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে। তবে এই কৌশল দীর্ঘস্থায়ী হলে তার অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্যয় অত্যন্ত বেশি হবে।
ইতিমধ্যে এই অভিযানে ১০ হাজারের বেশি সেনা এবং একাধিক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রাখা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, এই পরিস্থিতি চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে রাশিয়ার দিকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন একটি শক্তিশালী জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে তীব্র মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে জনসাধারণের অসন্তোষ বাড়তে পারে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালির আকাশ ও জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও ড্রোনের টহল অব্যাহত রয়েছে। ইরান এই অবরোধের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। দেশটি বলছে, তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও রাশিয়ার সমন্বিত প্রতিক্রিয়া, ইরানের সামরিক অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই সংকট কোন দিকে যাবে। এটি কি একটি সম্ভাব্য বড় যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হবে, নাকি বিশ্ব একটি নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণের সাক্ষী হবে—তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট