আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক এমন এক বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে টিকে থাকতে হলে তাকে সবসময় চলমান থাকতে হয়—ঠিক যেন সেই প্রজাতির হাঙরের মতো, যারা থেমে গেলে বাঁচতে পারে না। নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও অনেকের মতে, যুদ্ধ ও সংঘাতই তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধান উপায় হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক ইরান–ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে। পরমাণু অস্ত্র তৈরির অভিযোগ তুলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তকে অনেকেই রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে টানতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করেন নেতানিয়াহু। টানা ৪০ দিনের এই সংঘাত পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
তবে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে নতুন করে প্রশ্ন উঠে—এই শান্তির পরিবেশে নেতানিয়াহুর অবস্থান কী হবে? বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতিতে তিনি সন্তুষ্ট নন। কারণ, যুদ্ধ চলমান থাকলেই তার রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় থাকে। যুদ্ধবিরতি তার জন্য বরং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির একটি অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তার দাবি, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি আলোচনা চলাকালে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের কাছে নেতানিয়াহুর ফোনকলের পর আলোচনার গতি বদলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত আলোচনা ভেস্তে যায়। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি, তবুও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, লেবানন এই যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়ে না। ফলে সেখানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া হবে। এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে।
বর্তমানে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে বিনত জাবেইল এলাকায় হিজবুল্লাহর ঘাঁটিগুলোর ওপর ইসরায়েলি হামলা জোরদার করা হয়েছে। নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহকে দুর্বল করা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে তিনি ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই সামরিক অভিযানগুলোর পেছনে শুধু নিরাপত্তা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটও বড় ভূমিকা রাখছে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরায়েলে তিনটি ফৌজদারি মামলার বিচার চলছে—বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে। তিনি ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এসব মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
এই মামলাগুলো নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার কারাদণ্ড হতে পারে। ফলে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করে তিনি আদালতের কার্যক্রম পিছিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন।
গাজা যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে। আদালতের শুনানি বারবার স্থগিত হয়েছে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে। এমনকি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আদালতের কাছে আবেদন করেন, তার সাক্ষ্যগ্রহণ সপ্তাহে তিন দিনের পরিবর্তে দুই দিনে নামিয়ে আনার জন্য। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে।
এরপর মার্চে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ হলে আবারও বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়। এই ধারাবাহিকতা থেকে অনেকেই ধারণা করছেন, যুদ্ধ নেতানিয়াহুর জন্য একটি কার্যকর রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
শুধু বিচার নয়, ক্ষমতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রেও যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইসরায়েলে ২০২৬ সালের অক্টোবরে পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কমছে। নির্বাচন সামনে রেখে তিনি পরাজয়ের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নটি সামনে চলে আসে, যা রাজনৈতিক সমালোচনাকে আড়াল করতে সাহায্য করে।
চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক ইয়োসি মেকেলবার্গ মনে করেন, ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে জড়ানো নেতানিয়াহুর একটি উচ্চ ঝুঁকির বাজি। তিনি আশা করেছিলেন, এই যুদ্ধ তার রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে এবং নির্বাচনে জয়লাভ সহজ করবে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১০ শতাংশ ইসরায়েলি এই যুদ্ধকে সফল বলে মনে করেন। যুদ্ধের শুরুতে যেখানে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন ছিল ৪০ শতাংশ, তা এখন কমে ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
এদিকে গাজা, লেবানন ও ইরানে চলমান সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। ইরানে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। লেবাননে নিহতের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে। আর গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া অভিযানে নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজারের বেশি, আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষ।
এই মানবিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে নেতানিয়াহু তার অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং তিনি আঞ্চলিক বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে বিচার থেকে বাঁচা, অন্যদিকে নির্বাচনে জয়ী হওয়া। এই দুই লক্ষ্য অর্জনে তিনি যুদ্ধকে একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তবে এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। কারণ, দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং জনমতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে যুদ্ধ ও শান্তির এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর। যুদ্ধ চললে তিনি হয়তো কিছুটা সময় কিনতে পারবেন, কিন্তু স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই কৌশল কতদিন কার্যকর থাকবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আকাশজমিন / আরআর