যুক্তরাষ্ট্র এখন যত পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করছে, রপ্তানির পরিমাণও প্রায় তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, যার সুবিধা পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথমবারের মতো দেশটির তেল রপ্তানি আমদানির প্রায় সমান পর্যায়ে পৌঁছায় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের নিট আমদানি (আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান) কমে দৈনিক মাত্র ৬৬ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা ২০০১ সাল থেকে পাওয়া সাপ্তাহিক পরিসংখ্যানের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে দেশটির তেল রপ্তানি বেড়ে দৈনিক প্রায় ৫২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়, যা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফলে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত নিট রপ্তানিকারকের অবস্থানের কাছাকাছি চলে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৪৩ সালের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে এমন অবস্থানে এসেছে, যেখানে আমদানি ও রপ্তানি প্রায় সমান। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে বিশ্বের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ তেল ও গ্যাস পরিবহন কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের শোধনাগারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তেলের দিকে ঝুঁকছে।
রিস্ট্যাড এনার্জির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়ানিভ শাহ জানিয়েছেন, ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতারা এখন দূরবর্তী উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, পরিবহন ব্যয় বেশি হলেও বিকল্প উৎস না থাকায় মার্কিন তেলের চাহিদা বাড়ছে। এমনকি গ্রিসের মতো দেশও এই সময় প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে।
জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট রপ্তানির প্রায় ৪৭ শতাংশ ইউরোপে এবং প্রায় ৩৭ শতাংশ এশিয়ায় গেছে। শীর্ষ ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে নেদারল্যান্ডস, জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়া। একই সঙ্গে তুরস্কও দীর্ঘ সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের তেল আমদানি শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বড় পরিমাণ তেল আমদানি করে, কারণ দেশটির শোধনাগারগুলো ভারী ও উচ্চ সালফারযুক্ত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম হলেও দেশীয় উৎপাদিত তেল তুলনামূলক হালকা প্রকৃতির। ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামের ব্যবধান বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি সক্ষমতা বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। পাইপলাইন ও ট্যাংকার সীমাবদ্ধতার কারণে দেশটির দৈনিক সর্বোচ্চ রপ্তানি সক্ষমতা প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেলের কাছাকাছি। গত সপ্তাহে রপ্তানি ৫২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছানোয় বাজার প্রায় পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি চলে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে পরিবহন ও লজিস্টিক খরচ বাড়লে অতিরিক্ত রপ্তানি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। তবে বৈশ্বিক চাহিদা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।