দীর্ঘ এক দশকের বিরতির পর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। আগামী ঈদুল আজহার পর এ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন ও নেতৃত্বে নতুন গতি আনার লক্ষ্যেই এই আয়োজনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দলের শীর্ষ দুই পদ—চেয়ারম্যান ও মহাসচিব—এ পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে কৌতূহল এখন তুঙ্গে।
দলীয় সূত্র জানায়, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে তা করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ষষ্ঠ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এবার হবে বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল। প্রায় এক দশক পর হতে যাওয়া এই কাউন্সিলকে ঘিরে দলটির ভেতরে ও বাইরে নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
এবারের কাউন্সিলকে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে দলটি নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে স্থবির হয়ে পড়ে। এবার সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। দলীয় নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের কাউন্সিল হবে তুলনামূলকভাবে বেশি উৎসবমুখর এবং ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক।
বিএনপির প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ছয়টি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৮ সালের প্রথম কাউন্সিলে জিয়াউর রহমান দলীয় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। ১৯৮১ সালে তার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার দায়িত্ব নেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৪ সাল থেকে খালেদা জিয়া দলীয় নেতৃত্বে আসেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন।
সর্বশেষ ২০১৬ সালের কাউন্সিলে খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিব নির্বাচিত হন। সেই থেকে দীর্ঘ সময় ধরে এই দুই শীর্ষ পদে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে এবার কাউন্সিল সামনে রেখে নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। চেয়ারপারসন পদে তারেক রহমানের অবস্থান এবং মহাসচিব পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভূমিকা নিয়ে নানা মত রয়েছে। দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, বর্তমান নেতৃত্বকেই আবারও পুনর্নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হতে পারে, আবার নতুন নেতৃত্বও আসতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে কাউন্সিলের গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এবারের কাউন্সিল নিয়ে প্রত্যাশা অনেক বেশি। অতীতে রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে দলীয় কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। তবে এবার পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনুকূল থাকায় কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে সারাদেশে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তার মতে, নতুন নেতৃত্ব দলকে আরও সুসংগঠিত করবে।
দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময় তা হয়নি। এবার সেই ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কাউন্সিলের মাধ্যমে স্থায়ী কমিটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে শূন্য থাকা পদগুলো পূরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থায়ী কমিটিতে নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। রুহুল কবির রিজভী, শামসুজ্জামান দুদু, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, জয়নুল আবদিন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীসহ বেশ কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় আছে। একই সঙ্গে কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।
বর্তমানে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে পদাধিকার বলে রয়েছেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ মোট কয়েকজন শীর্ষ নেতা। তবে শারীরিক অসুস্থতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে কয়েকজন সদস্য সক্রিয় নন। ফলে নেতৃত্ব কাঠামো পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন দলীয় নেতারা।
নতুন কাউন্সিলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—শীর্ষ দুই পদে পরিবর্তন আসবে কি না। একাংশের ধারণা, বর্তমান নেতৃত্বই পুনরায় নির্বাচিত হতে পারেন। আবার আরেক অংশ মনে করছে, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনার মাধ্যমে দলকে আরও গতিশীল করা হবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কাউন্সিলের ভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
দলীয় নেতারা বলছেন, এবারের কাউন্সিল শুধু সাংগঠনিক আয়োজন নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। ফলে এই কাউন্সিল বিএনপির জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।