নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের প্রভাব বলয় ধীরে ধীরে হারাচ্ছে এবং অনেক মিত্র দেশ এখন বাধ্য হয়ে মার্কিন প্রতিপক্ষ রাশিয়া ও ইরানের দিকে ঝুঁকছে। জ্বালানি সংকট, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এই পরিবর্তনের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো এখন রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে নতুন করে জ্বালানি চুক্তি করতে বাধ্য হচ্ছে। আগে এসব দেশ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মেনে রাশিয়া বা ইরান থেকে তেল আমদানি এড়িয়ে চলত। কিন্তু বর্তমান সংকট সেই অবস্থান বদলে দিয়েছে।
এক বছর আগেও এশিয়ার যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ দেশগুলো রাশিয়ার তেল বর্জন করত এবং ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল সীমিত। কিন্তু ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেল সরবরাহে ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়। এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল এশিয়ার বাজারে পৌঁছায়। ফলে দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ভারতসহ বহু দেশ তেলের ঘাটতিতে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে দেশগুলো এখন বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এমনকি ওয়াশিংটন কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করায় এই বাণিজ্য আরও সহজ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া সম্প্রতি রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ও ন্যাপথা আমদানির অনুমতি দিয়েছে। দেশটির নীতি নির্ধারকরা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস খোঁজা এখন জরুরি।
অন্যদিকে ফিলিপাইন দীর্ঘ পাঁচ বছর পর রাশিয়া থেকে তেল আমদানি শুরু করেছে এবং দেশটিতে ইতোমধ্যে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটি একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ভারতের দিকেও নজর রাখছে।
ভারতও আবার ইরান ও রাশিয়া থেকে সীমিত পরিসরে তেল আমদানি শুরু করেছে। যদিও দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার, তবুও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ইন্দোনেশিয়াও রাশিয়া থেকে এলপিজি ও জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটি নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নিচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে বড় ধাক্কা। কারণ দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের মাধ্যমে শক্তিশালী প্রভাব বজায় রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অনিশ্চয়তা এবং প্রেসিডেন্টের অস্পষ্ট অবস্থান অনেক দেশকে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করছে। ফলে রাশিয়া ও ইরান আবার বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে উঠে আসছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। রুশ তেল এখন বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, কারণ বিকল্প কম।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এখন নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে তারা রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাস্তব অর্থনৈতিক প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটে রাশিয়া ও ইরানের দিকে ঝুঁকছে—এটি এক নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমলে এশিয়ায় নতুন শক্তি সমীকরণ তৈরি হতে পারে, যেখানে রাশিয়া, চীন ও ইরানের ভূমিকা বাড়বে।
তবে অনেকেই মনে করেন, এটি স্থায়ী পরিবর্তন নয়, বরং সাময়িক সংকটের প্রতিফলন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেশগুলো আবারও পশ্চিমা জোটের দিকে ফিরতে পারে।