আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইসরায়েলের শীর্ষ নেতারা একটি নতুন ‘আগ্রাসী’ বিশ্বব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে চাইছেন বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। একই সঙ্গে বাকি বিশ্বের দেশগুলো তাঁদের থামাতে ব্যর্থ হয়ে ‘কাপুরুষোচিত’ আচরণ করছে বলেও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার লন্ডনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন সংগঠনের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করেন।
অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেন, এই তিন দেশের নেতৃত্বাধীন বিশ্বরাজনীতি এখন এমন এক পথে যাচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং কূটনৈতিক সমঝোতার ভিত্তি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাঁর ভাষায়, “বিশ্ব এখন এমন এক আগ্রাসী ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে, যেখানে যুদ্ধ ও ক্ষমতা প্রদর্শনই মূল নিয়ামক হয়ে উঠছে।”
অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা এখন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। এর পরিবর্তে এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যেখানে নৈতিকতার চেয়ে শক্তি প্রদর্শনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই প্রবণতার ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে “নৈতিক দিকনির্দেশনাহীন” পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যেখানে যুদ্ধ, দমন-পীড়ন এবং সহিংসতাকে কূটনীতির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অ্যাগনেস ক্যালামার্ড সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর মতে, “আমরা এমন একটি সময়ের মধ্যে আছি, যা গত ৮০ বছরে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দিতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালজুড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ বিভিন্ন নেতা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য ব্যাপক আন্তর্জাতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছেন। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘন, দমন-পীড়ন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
অ্যামনেস্টির মহাসচিবের অভিযোগ, এই নেতারা তাঁদের ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে উপেক্ষা করছেন। তাঁর মতে, “যে কোনো বাধা তাঁদের কাছে ধ্বংসযোগ্য হয়ে উঠছে। মানবাধিকারের সর্বজনীন নীতিমালা এখন সরাসরি আক্রমণের মুখে।”
প্রতিবেদনে ইউরোপসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের অবস্থানকেও সমালোচনা করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি বলছে, অনেক দেশ এই “আগ্রাসী” শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে নীরবতা বা তোষণনীতি গ্রহণ করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে প্রতিবেদনে এই নতুন বিশ্বব্যবস্থার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন পরিস্থিতি এবং আশপাশের অঞ্চলে চলমান সহিংসতা এই প্রবণতার প্রতিফলন বলে দাবি করা হয়।
অ্যাগনেস ক্যালামার্ড যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনেরও সমালোচনা করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে “আইনের শাসন খর্ব করা নজিরবিহীন কর্মকাণ্ড” এবং “ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারী ব্যবহার”-এর অভিযোগ তোলেন।
তবে প্রতিবেদনে চীনকে সরাসরি “আগ্রাসী” তালিকায় রাখা হয়নি। এ বিষয়ে অ্যামনেস্টি বলেছে, চীন তুলনামূলকভাবে কৌশলগত ও বিবেচনাপ্রসূত আচরণ করছে। তবে একই সঙ্গে দেশটির বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এবং রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রমকে পরোক্ষভাবে সমর্থনের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
অ্যামনেস্টির মতে, বিশ্ব এখন এমন এক সংকটময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ব নেতাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা না থাকলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা আরও হুমকির মুখে পড়বে।
সংগঠনটি শেষ পর্যন্ত সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব একটি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ও সংঘাতের যুগে প্রবেশ করতে পারে, যেখানে মানবাধিকার আরও বেশি উপেক্ষিত হবে।