ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

হরমুজে আটকে ‘বাংলার জয়যাত্রা’

আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে বাধা—হরমুজে নতুন সংকট


  • আপলোড সময় : বুধবার ২২ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৮:৫৮ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইরান। এই পরিস্থিতিতে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর অনুমতি না পাওয়ায় বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ প্রণালিটি অতিক্রম করতে পারছে না। একদিকে ইরানের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে অনুমতি না পাওয়ায় তৈরি হয়েছে জটিলতা ও প্রশ্ন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান রোববার (১৯ এপ্রিল) রাতে তুরস্কে এক বৈঠকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহকে জাহাজটি নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার জন্য সহায়তা করতে অনুরোধ জানিয়েছেন বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে বোঝা যায়, বিষয়টি এখন কূটনৈতিক পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনায় রয়েছে।

এদিকে শুধু বাংলাদেশি জাহাজই নয়, ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি জাহাজও ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় সৌদি আরবের জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ওয়েল নিয়ে চট্টগ্রামে আসতে পারেনি। ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

এপ্রিলের শুরুতে ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত হরমুজ প্রণালি পারাপারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি জাহাজকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারও আগে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশের জাহাজ চলাচল করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে সেই আশ্বাস কার্যকর হয়নি।

দুই দফা চেষ্টা করেও হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে না পেরে প্রায় ৩৭ হাজার টন সারবোঝাই ‘বাংলার জয়যাত্রা’ বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছে অবস্থান করছে। জাহাজটির নিরাপদ গমন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ইরান কেন বাংলাদেশি জাহাজকে বাধা দিচ্ছে? এ প্রসঙ্গে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির মনে করেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অবস্থানেই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশ বরাবরই কোনো দেশের ওপর আক্রমণ সমর্থন করে না, কিন্তু এবারের বিবৃতিতে সেই অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইরানে হামলার ঘটনা এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া বিবৃতি তেহরানকে অসন্তুষ্ট করেছে। বিশেষ করে ওই বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ না করা এবং হামলার নিন্দা না জানানো ইরানের কাছে নেতিবাচক বার্তা হিসেবে গেছে।

বাংলাদেশ সরকারের ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে—যা নিয়ে নিন্দা জানানো হয়। তবে এতে হামলার সূত্রপাত নিয়ে কোনো সরাসরি অবস্থান নেওয়া হয়নি। ফলে এটি ভারসাম্যপূর্ণ হলেও ইরানের দৃষ্টিতে অসম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

পরে দেশের ভেতরে সমালোচনা তৈরি হলে ২ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্ষিপ্ত আরেকটি বিবৃতি দেয়, যেখানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে ইরানের জনগণের প্রতি শোক প্রকাশ করা হয়। কিন্তু কূটনৈতিক মহলের মতে, এই পদক্ষেপ দেরিতে নেওয়ায় ততটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি।

ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী নিজেও এক সাক্ষাৎকারে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট নয়। তিনি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী জনমতের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশকেও আরও সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।

এদিকে একই সঙ্গে আশ্বাসও দিচ্ছে ইরান। ঢাকায় অবস্থিত ইরান দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশি জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে তারা সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরকে সংযুক্ত করা এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখা ইরানের অগ্রাধিকার।

প্রসঙ্গত, ‘বাংলার জয়যাত্রা’ গত ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে বিভিন্ন বন্দরে পণ্য সরবরাহ করে। পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে যায় জাহাজটি।

কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ওই বন্দরের কাছাকাছি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে, যা জাহাজটির নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এরপর আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ডের পরামর্শে জাহাজটি গভীর সমুদ্রে অবস্থান নেয়।

পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’। কিন্তু ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় সেটি সফল হয়নি।

পরে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে জাহাজটি প্রণালির ২০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে পৌঁছালে ইরানের নৌবাহিনী সেটিকে ফিরে যেতে নির্দেশ দেয়। এতে করে স্পষ্ট হয়, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ফারাক রয়েছে।

সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশি জাহাজ পারাপার নিয়ে আশ্বাস ও বাধার এই দ্বৈত পরিস্থিতি মূলত কূটনৈতিক টানাপোড়েন, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং নিরাপত্তাজনিত হিসাব-নিকাশের ফল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এখন কূটনৈতিক সমাধানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা


এ সম্পর্কিত আরো খবর