যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল—এমনটাই মনে হচ্ছিল গত সপ্তাহের শেষভাগে। কিন্তু ঠিক সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর একের পর এক প্রকাশ্য মন্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে এবং আলোচনার অগ্রগতি হঠাৎ থমকে যায়।
সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা তাঁকে আলোচনার বিষয়গুলো প্রকাশ্যে না আনতে অনুরোধ করেছিলেন। কারণ এই ধরনের সংবেদনশীল আলোচনায় গোপনীয়তা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সে পরামর্শ উপেক্ষা করে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে মন্তব্য করতে থাকেন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গেও নিয়মিত কথা বলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে দর-কষাকষির কৌশল প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে এমন কিছু দাবি করেন, যা ইরানি কর্মকর্তারা পরে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি ইরান নতুন করে আলোচনায় প্রস্তুত—ট্রাম্পের এই দাবিও তেহরান অস্বীকার করে।
ফলে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুতই দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমানে আলোচনা কোন দিকে এগোবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন, প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য মন্তব্য আলোচনার জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস এমনিতেই আলোচনাকে জটিল করে তুলেছে, তার ওপর এই ধরনের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে দেয়।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরছিলেন, যেন ইরান ইতোমধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্তে সম্মতি দিয়েছে। অথচ বাস্তবে সেই বিষয়ে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। এতে ইরানের পক্ষের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয় এবং তারা নিজেদের অবস্থান দুর্বল দেখাতে চায়নি।
প্রকাশ্যে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করতে রাজি হয়েছে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণেও সহযোগিতা করবে। কিন্তু এসব দাবির সত্যতা ইরান অস্বীকার করেছে।
এদিকে আলোচনার মধ্যেই ওমান উপসাগরে একটি উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার একটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজে গুলি চালিয়ে সেটি জব্দ করে। এই ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে এবং আলোচনার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে আসার প্রেক্ষাপটে এখন ট্রাম্পের সামনে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—তিনি কি একটি চুক্তির পথে এগোবেন, নাকি সংঘাত আরও বাড়াবেন।
যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ইরানের জন্য কিছু শর্ত নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত করা এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করা। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা দাবি জানিয়েছে—হরমুজ প্রণালি-এর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
আলোচনার এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের প্রস্তাব দেয়, যার বিপরীতে ইরান পাঁচ বছরের প্রস্তাব দেয়। পরে আরও নমনীয় একটি প্রস্তাব হিসেবে ১০ বছরের স্থগিতাদেশ এবং পরবর্তী সময়ে সীমিত কার্যক্রমের পরিকল্পনাও সামনে আসে। তবে ট্রাম্প প্রকাশ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়ে আলোচনার অবস্থানকে আরও কঠোর করে তোলেন।
একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের জব্দ সম্পদ মুক্ত করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছিল, যা ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারত। কিন্তু এসব সম্ভাবনাও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সবশেষে, আলোচকদের আশা ছিল অন্তত একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে, যা ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ চুক্তির পথ খুলে দেবে। কিন্তু ট্রাম্পের ধারাবাহিক প্রকাশ্য মন্তব্য সেই সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: সিএনএন