বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় আবহাওয়াবিদরা ভয়ংকর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, চলতি বছরের মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এল নিনো তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হয়ে বিরল “সুপার এল নিনো”তে রূপ নিতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং আবহাওয়ার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা মানবজীবন, কৃষি এবং পরিবেশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। খবরটি প্রকাশ করেছে নিউজউইক।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা প্রায় ৬১ শতাংশ। এই জলবায়ু পরিস্থিতি ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ এবং প্রস্তুতি দুটোই বাড়ছে।
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলপ্রবাহের একটি বিশেষ পর্যায়। এর বিপরীত প্রক্রিয়াকে বলা হয় লা নিনা, যা তুলনামূলক শীতল জলপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত। এই দুই প্রক্রিয়া বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। আবহাওয়াবিদরা দীর্ঘদিন ধরে এই দুই জলবায়ু ধাপের ওপর নজর রাখছেন, কারণ এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মৌসুমি বৃষ্টি, খরা এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ।
আবহাওয়া বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রের গড় তাপমাত্রা যদি কয়েক মাস ধরে দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পায়, তাহলে সেটিকে “সুপার এল নিনো” বলা হয়। আবহাওয়াবিদ পল প্যাস্টেলকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ঘটনার সুপার এল নিনোতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১৫ শতাংশ। তিনি জানিয়েছেন, এটি ২০২৩ ও ২০২৪ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ চ্যাড মেরিল জানিয়েছেন, এল নিনোর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। এতে কিছু এলাকায় খরার ঝুঁকি কমলেও অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘ সময় শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। বিশেষ করে টেক্সাস থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। কৃষি উৎপাদন নির্ভর অঞ্চলগুলোতে আবহাওয়ার এই পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের আবহাওয়াবিদ বেন নোল জানিয়েছেন, আসন্ন অক্টোবর মাসে মধ্য ও উত্তর ভারতে খরার সম্ভাবনা রয়েছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে গেলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
এল নিনোর প্রভাব শুধু উত্তর গোলার্ধেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও তীব্র তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বছরের শেষের দিকে ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনের কিছু এলাকায় খরার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এসব অঞ্চলে কৃষি, পানিসম্পদ এবং খাদ্য নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এল নিনো আটলান্টিক মহাসাগরের হারিকেন মৌসুমেও প্রভাব ফেলতে পারে। সাধারণত জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলা এই মৌসুমে ক্রান্তীয় ঝড় ও হারিকেনের সংখ্যা কমে যেতে পারে। তবে একই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ভারসাম্য আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই পূর্বাভাসের মধ্যে এখনো কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইউরোপীয় সেন্টার ফর মিডিয়াম রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্ট একটি ব্লগে জানিয়েছে, বসন্তকালে এল নিনো সম্পর্কিত পূর্বাভাস সবসময় পুরোপুরি নির্ভুল হয় না। এই সময়কে আবহাওয়াবিদরা “বসন্তকালীন পূর্বাভাস বাধা” হিসেবে উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে এল নিনো নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ুর এই পরিবর্তন যদি শক্তিশালী আকার ধারণ করে, তবে তা শুধু আবহাওয়াই নয়, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং জনজীবনের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
আকাশজমিন / আরআর