আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাণিজ্যে ক্রমশ গভীর সংকট তৈরি করছে, যার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পানামা খাল এবং মালাক্কা প্রণালিকে ঘিরে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন রুটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এতে করে জরুরি পণ্য পরিবহনের জন্য বিকল্প রুট হিসেবে পানামা খালের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে মালাক্কা প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব সামনে এসেছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে চলমান অস্থিরতার কারণে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে এশিয়ার শোধনাগারগুলো তাদের আমদানি কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। উপসাগরীয় উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানির দিকে ঝুঁকছে। এই পরিবর্তনের কারণে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী পানামা খালের গুরুত্ব হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে গেছে।
পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ চলাচলে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এই খাল পার হতে জাহাজগুলোকে কয়েক দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো, তবে এখন জরুরি পণ্য পরিবহনের জন্য কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে দ্রুত অগ্রাধিকার পাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে জাহাজগুলো প্রায় ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করে নির্ধারিত লাইনের বাইরে গিয়ে দ্রুত পার হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
পানামা খালের মাধ্যমে দ্রুত অগ্রাধিকার পাওয়ার এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন এক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী একটি জাহাজ সম্প্রতি বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাল পার হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়াতে পারে এবং বৈশ্বিক বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে মালাক্কা প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া। তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়া এখন আর নিজেদের প্রান্তিক দেশ হিসেবে দেখতে চায় না এবং কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়।
তিনি আরও বলেন, মালাক্কা প্রণালি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক নৌপথ হলেও এখনো এটি ব্যবহারের জন্য কোনো শুল্ক আরোপ করা হয়নি। তার মতে, হরমুজ প্রণালির মতোই যদি মালাক্কা প্রণালিতে শুল্ক ব্যবস্থা চালু করা যায়, তাহলে ইন্দোনেশিয়া বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। তবে তিনি স্বীকার করেন, এই সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া সম্ভব নয়, কারণ মালাক্কা প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিংগাপুরের মধ্যে বিভক্ত।
তিনি আরও বলেন, এই ধরনের নীতি বাস্তবায়নের আগে আঞ্চলিক সমঝোতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কৌশলগত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র রক্ষণাত্মক চিন্তা নিয়ে এগোনো ঠিক হবে না, বরং আক্রমণাত্মক অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
তবে ইন্দোনেশিয়ার এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সিংগাপুর ও মালয়েশিয়া। সিংগাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মালাক্কা ও সিংগাপুর প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে এবং কোনো ধরনের শুল্ক বা বাধা আরোপ গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, এই প্রণালির মাধ্যমে জাহাজ চলাচলের অধিকার আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা স্বীকৃত এবং এটি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। সিংগাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া তিনটি দেশই বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল, তাই এই নৌপথ উন্মুক্ত রাখা সবার স্বার্থে জরুরি।
মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লোকও একই অবস্থান ব্যক্ত করে বলেছেন, মালাক্কা প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মালয়েশিয়া প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আন্তর্জাতিক আইন এবং নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একদিকে হরমুজ প্রণালির সংকট এবং অন্যদিকে মালাক্কা প্রণালিকে ঘিরে নতুন শুল্ক বিতর্ক বিশ্ববাণিজ্যে এক নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা, নৌপথ নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট নিয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে চাপা প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।