ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একাধিক গুরুতর অস্ত্রোপচারের কারণে তিনি সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্রিয় থাকতে পারছেন না বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। একই সঙ্গে দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্র ক্রমেই সামরিক বাহিনীর দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলেও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে গত মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো অডিও বা ভিডিও বার্তাও প্রকাশ করা হয়নি, যা দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা তৈরি করেছে।
মোজতবার অনুপস্থিতির সুযোগে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর অভিজ্ঞ কমান্ডাররা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান ভূমিকা পালন করছেন। নিরাপত্তা, সামরিক কৌশল ও পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এখন এই বাহিনীর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক পর্যবেক্ষক জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মোজতবা খামেনির ভূমিকা অনেকটা তত্ত্বাবধায়ক পর্যায়ের। তিনি সরাসরি সিদ্ধান্ত না নিয়ে একটি সমন্বয়কের মতো কাজ করছেন। বিষয়টি অনেকটা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের মতো, যেখানে বড় সিদ্ধান্তগুলো যৌথভাবে নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন এবং মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হন। সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তাঁর অবস্থান গোপন রাখতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সরাসরি সাক্ষাৎ প্রায় বন্ধ রাখা হয়েছে।
মোজতবার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানা গেছে, তাঁর শরীরে একাধিক বড় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর একটি পায়ে তিনবার অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সেখানে কৃত্রিম পা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। তাঁর একটি হাতেও অস্ত্রোপচার করা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া তাঁর মুখ ও ঠোঁট মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে, যার ফলে কথা বলতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তিনি। এ অবস্থার উন্নতির জন্য ভবিষ্যতে আরও প্লাস্টিক সার্জারি করা হতে পারে। তবে শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও মানসিকভাবে তিনি সম্পূর্ণ সচেতন রয়েছেন এবং দূর থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মোজতবা খামেনির চিকিৎসায় সরাসরি যুক্ত রয়েছেন ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও স্বনামধন্য হার্ট সার্জন মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলছেন, যাতে তাঁর অবস্থান গোপন রাখা যায়।
যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদানে বিশেষ বার্তাবাহক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব বার্তাবাহক সড়ক ও মহাসড়ক পথে গোপনে তাঁর অবস্থানে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন এবং একইভাবে তাঁর নির্দেশনা সংশ্লিষ্টদের কাছে ফিরিয়ে আনছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, যেখানে একজন নেতার সরাসরি উপস্থিতির পরিবর্তে একটি সামরিক ও প্রশাসনিক সমন্বিত কাঠামো কার্যকর হয়ে উঠছে।