নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ১১ বছর বয়সী শিশু হোসাইনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারই সমবয়সী ও কিশোর বন্ধুদের একটি দল। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে উঠে এসেছে অবিশ্বাস্য এক কারণ—জেল খাটা কেমন, সেই কৌতূহল থেকেই তারা পরিকল্পিতভাবে এই নৃশংস অপরাধ সংঘটিত করে।
সোমবার নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান মুন্সি এক সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেন। তিনি জানান, নিহত হোসাইন তার বাবার সঙ্গে শহরে ফুল বিক্রি করত। গত ১৮ এপ্রিল সকাল থেকে সে নিখোঁজ ছিল। পরে ২৩ এপ্রিল শুক্রবার বিকেলে দাপা ইদ্রাকপুর ব্যাংক কলনি এলাকার মিঠুমিয়ার পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের তদন্তে জানা যায়, ফতুল্লা রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়মিত আড্ডা দেওয়া এবং মাদক সেবনে জড়িত কয়েকজন কিশোর এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ঘটনার দিন তারা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হোসাইনকে ডেকে নিয়ে যায়।
পুলিশ সুপার জানান, অভিযুক্ত কিশোরদের মধ্যে সাইফুল, তানভীর ও ইউনুস নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে যে, খুন করলে জেলে যেতে হয়—আর সেই অভিজ্ঞতা নেওয়ার আগ্রহ থেকেই তারা এই পরিকল্পনা করে। পরে তারা পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া হোসাইনকে লক্ষ্য করে এবং তাকে গাঁজা সেবনের প্রলোভন দেখিয়ে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যায়।
সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল তাদের আরও তিন বন্ধু—রাহাত, হোসাইন ও ওমর। একপর্যায়ে তারা সবাই মিলে শিশুটিকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। হত্যার পর তারা লাশটি ওই পরিত্যক্ত বাড়িতে ফেলে রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
লাশ উদ্ধারের পরপরই পুলিশ অভিযান শুরু করে। প্রথমে ইয়াসিনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে আরও পাঁচ কিশোরকে আটক করা হয়। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন এজাহারভুক্ত এবং তদন্তের মাধ্যমে আরও ২ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
পরে মামলার এজাহারনামীয় ১ নম্বর আসামি ইয়াসিন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো ছুরিও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে এ ঘটনায় এখনও একজন পলাতক রয়েছে, তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা, কৌতূহল এবং মাদকাসক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কিশোরদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে, এই মর্মান্তিক ঘটনা সমাজে কিশোর অপরাধের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। শিশু হোসাইনের নির্মম হত্যাকাণ্ড এলাকাজুড়ে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।