চট্টগ্রাম নগরে মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। বিশেষ করে পাঁচলাইশ ও প্রবর্তক এলাকায় দোকানপাট, ক্লিনিক ও সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ। অনেকেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসার মতো অবস্থায় পড়েছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে ‘আয়াত সার্জিক্যাল’ নামের একটি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের দোকানের মালিক তানভির আহমেদ বলেন, “পানি হু হু করে ঢুকেছে। ১০ মিনিটের মধ্যে বুকসমান পানি হয়ে যায় দোকানে। কিছুই বের করতে পারিনি। আমি পথে বসে গেলাম।” তিনি জানান, তাঁর ক্ষতির পরিমাণ ৫০ লাখ টাকার বেশি।
মঙ্গলবার দুপুরের দিকে প্রথম দফায় দোকানটিতে পানি ঢুকে পড়ে। পরদিন বুধবার আবারও পানি ঢুকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। দোকানটির ভেতরের মেঝে সড়কের চেয়ে প্রায় ছয় ফুট নিচু হওয়ায় পানি জমে থেকে যায় এবং ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি।
দোকানের প্রায় সব পণ্য পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার, ইলেকট্রিক বেড, নেবুলাইজার, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর, ব্লাড প্রেশার মেশিন, অক্সিমিটার, কম্পিউটার, সিসিটিভি ক্যামেরা, মনিটর ও আইপিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়েছে। কিছু সরঞ্জাম সিটি করপোরেশনের গাড়িতে করে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
তানভির আহমেদ অভিযোগ করেন, পাশের হিজড়া খালে চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ ধীরগতির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। খালে অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে পানি চলাচল বন্ধ করে রাখায় অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা পানির নিচে চলে যাচ্ছে।
একই এলাকার ‘মা ড্রাগ হাউস’ নামের একটি ফার্মেসিতেও প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কর্মচারী বিংকি দাশ জানান, হঠাৎ করে পানি ঢুকে নিচে রাখা সব ওষুধ নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “এত বছর কাজ করছি, কখনো দোকানে পানি ঢোকেনি। এবারই প্রথম এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম।”
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় হলি হেলথ হাসপাতালের পাশের একটি ভবনের নিচতলায় দন্তচিকিৎসক উম্মে রিফাত হাসনাত নাবিলার চেম্বারটিও পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “চেম্বারে এখন আর রোগী দেখার সুযোগ নেই। সবকিছু পানির নিচে। নতুন করে শুরু করতে হবে, কিন্তু কীভাবে তা বুঝতে পারছি না।”
নগরের অন্তত ২০টি এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, এতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। রাস্তাঘাট, অলিগলি ও দোকানপাট পানিতে ডুবে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। প্রবর্তক মোড় ও কাতালগঞ্জ এলাকায় এখনো হাঁটুপানি থেকে বুকসমান পানি জমে রয়েছে, যা চলাচলে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।
পথচারীরা জুতা হাতে নিয়ে পানি পার হচ্ছেন, কেউ আবার সড়ক বিভাজকের ওপর দিয়ে চলাচল করছেন। যানবাহন চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়েছে এবং অনেক জায়গায় সৃষ্টি হয়েছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. নুরুল করিম বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় এখনো দুটি খালের কাজ চলমান রয়েছে। এসব খালে অস্থায়ী বাঁধ থাকায় কিছু এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে। তিনি জানান, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে আগামীতে জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে আসবে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতি বর্ষাতেই একই দুর্ভোগ পোহাতে হবে।