আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সকাল আটটা থেকে ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩টির ভোট গণনা শুরু হলেও একটি আসনে পুনরায় ভোটগ্রহণ হবে। গণনার শুরু থেকেই বিজেপির অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এই প্রবণতা রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
প্রথম দফার গণনায় দেখা যায়, বিজেপি একাধিক জেলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গ মিলিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আসনে তারা এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস লড়াইয়ে থাকলেও বিজেপিকে টপকে এগিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা যদি শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, তবে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে।
উত্তরবঙ্গ বরাবরই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই অঞ্চলে তাদের শক্ত অবস্থান দেখা গিয়েছিল। এবারও কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও কালিম্পং–এ বিজেপি ভালো অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের দুই মেদিনীপুর, বীরভূম, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার মতো জেলাতেও তারা অগ্রগতি দেখাচ্ছে।
দ্বিতীয় দফার ভোটে দক্ষিণবঙ্গের ৭ জেলার ১৪২ আসনের মধ্যে গত নির্বাচনে বিজেপি মাত্র ১৮টি আসন পেয়েছিল। তবে এবারের প্রবণতায় তারা একাধিক আসনে এগিয়ে রয়েছে, যা রাজনৈতিক মহলে বিস্ময় তৈরি করেছে। কলকাতা, হাওড়া এবং পূর্ব বর্ধমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলাতেও বিজেপি এবার কিছু আসনে এগিয়ে রয়েছে, যেখানে আগে তাদের অবস্থান দুর্বল ছিল।
হুগলির ১৮ আসনের মধ্যে গতবার বিজেপি মাত্র ৪টি আসনে জয় পেয়েছিল। এবার প্রাথমিক গণনায় তারা প্রায় ৮টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। পশ্চিম বর্ধমানের ৯টি আসনের প্রায় সবকটিতেই বিজেপি এগিয়ে রয়েছে বলে জানা গেছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি।
উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মোট ৬৪ আসনের মধ্যে গতবার বিজেপি মাত্র ৬টি আসন পেয়েছিল। এবার তারা প্রায় ১৪টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব মেদিনীপুরে বিজেপির শক্ত অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে তারা প্রায় সব আসনেই এগিয়ে রয়েছে। নন্দীগ্রামে গতবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। এবারও সেই আসনে তিনি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন বলে গণনার ট্রেন্ডে দেখা যাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভবানীপুর আসনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরুতে এগিয়ে থাকলেও পরে আবার পিছিয়ে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। শুভেন্দু অধিকারীও সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
নদীয়া ও উত্তর চব্বিশ পরগনায় বিজেপির অগ্রগতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিশেষ করে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত ইস্যুতে মতুয়া ভোট বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে, যা নদীয়ার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। নদীয়ার ১৭ আসনের মধ্যে গতবার বিজেপি ৯টি আসনে জয় পেয়েছিল, এবার তারা আরও দুটি আসনে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ভোট গণনাকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কড়া ছিল। কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী এবং স্থানীয় পুলিশের যৌথ নিরাপত্তায় ভোট গণনা পরিচালিত হয়। বিশাল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন, প্রশাসনিক রদবদল এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নির্বাচনকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও ছিল নজরকাড়া। বিভিন্ন এলাকায় ভোটের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখা গেছে, যা প্রায় ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায় বলে প্রাথমিক তথ্য থেকে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের কারণে অনেক নতুন ভোটার অংশগ্রহণ করেছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা একটি সরকারের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক ক্ষোভ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এই নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে প্রচারণা কৌশল এবং সংগঠিত নির্বাচনী কৌশল বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তৃণমূল কংগ্রেস এই নির্বাচনে ‘বাঙালি পরিচয় বনাম বহিরাগত প্রভাব’—এই রাজনৈতিক আখ্যান সামনে আনলেও তা ভোটারদের বড় অংশকে প্রভাবিত করতে পারেনি বলে প্রাথমিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, এসআইআর ও ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মুসলিম ভোট নিয়েও বিভিন্ন জল্পনা ছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, এই ভোট এককভাবে তৃণমূলের দিকে যাবে। কিন্তু প্রাথমিক প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর চব্বিশ পরগনার কিছু অংশে ভোট বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে বিভক্ত হয়েছে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিজেপির এই অগ্রগতি যদি চূড়ান্ত ফলাফলেও প্রতিফলিত হয়, তবে তা শুধু রাজ্য নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।