যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসরত চীনা নাগরিকদের ফেরত নিতে বেইজিংয়ের গড়িমসি এবং চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে চীনের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বৈধ নথিবিহীন চীনা নাগরিকদের ফেরত নিতে চীন কর্তৃপক্ষের অনীহা ও ধীরগতির কারণে ওয়াশিংটন এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, যদি চীন দ্রুত তাদের নাগরিকদের ফেরত না নেয়, তাহলে প্রথম ধাপে ভিসা নীতি কঠোর করা হবে এবং পরে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দিকে যাবে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চীনা নাগরিকদের জন্য ভিসা ফি বৃদ্ধি, ভিসা বাতিলের হার বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির ভিসা সীমিত করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে স্থায়ী ভিসা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে এক লাখেরও বেশি নথিবিহীন চীনা নাগরিক বসবাস করছেন। এর মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে চীনের সহযোগিতার অভাবে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আগের প্রশাসনের সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে বিপুল সংখ্যক চীনা নাগরিক প্রবেশ করেছেন বলে সরকারি তথ্যের বরাতে জানা গেছে। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অভিবাসন নীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন কয়েক দফায় প্রায় ৩ হাজার নাগরিককে ফেরত নিয়েছিল। তবে গত ছয় মাস ধরে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আর কোনো নথিবিহীন নাগরিককে ফেরত নেয়নি বেইজিং।
ট্রাম্প প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা জানান, চীনের সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে, তবে কার্যকর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বরং বেইজিং পরোক্ষভাবে জানিয়েছে, এই ইস্যুতে তারা পূর্ণ সহযোগিতা করতে আগ্রহী নয়।
এই অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্র “অসহযোগিতাপূর্ণ” হিসেবে দেখছে বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটনের মতে, এ ধরনের মনোভাব ভবিষ্যতে চীনের বৈধ ভিসাধারী নাগরিকদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
আগামী ১৪ ও ১৫ মে বেইজিং সফরে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ সেখানে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক আলোচনায় বড় ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবে, যা আগামী নির্বাচনের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে একই সময়ে ভিসা নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তুতি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে “অবৈধ অভিবাসীমুক্ত দেশ” গড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ আসছে। সাবেক প্রশাসনের সময় থেকে শুরু হওয়া সীমান্ত সংকট এখন নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে।
চীন সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে, অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন উত্তেজনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।