যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ধারাবাহিক সামরিক হামলা সত্ত্বেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখনো কার্যত অক্ষত রয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, গত দুই মাসের যুদ্ধ এবং তার আগে পরিচালিত হামলাগুলোর ফলে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। খবর রয়টার্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের এখনো প্রায় ৯ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে। এই সময়সীমা গত বছরের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ, এত হামলার পরও তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কাঙ্ক্ষিতভাবে পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার লক্ষ্যেই সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, হামলাগুলো মূলত ইরানের প্রচলিত সামরিক অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং অন্যান্য কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে। ফলে পারমাণবিক কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, বেশির ভাগই অক্ষত রয়েছে।
গত বছরের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে প্রায় এক বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তবে পরবর্তীতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া নতুন করে দুই মাসের যুদ্ধেও সেই সময়সীমার কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর অর্থ হলো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আগের অবস্থানেই রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করা হলে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই মজুত কোথায় রাখা হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ইরানের কর্মসূচি বন্ধ করা সম্ভব নয়। বরং তাদের কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করা বা সরিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে। কারণ, এই উপাদানই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মূল ভিত্তি।
গত জুনে পরিচালিত হামলায় নাতাঞ্জ, ফোরদো এবং ইস্পাহানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা এখনো ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি। ধারণা করা হচ্ছে, এই মজুতের একটি বড় অংশ ইস্পাহানের একটি সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ টানেলে সংরক্ষিত রয়েছে, যেখানে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে নতুন করে সামরিক কৌশল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, ‘গ্রাউন্ড রেইড’ বা সরাসরি স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও বিবেচনায় আনা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ইরানের গোপন স্থাপনায় প্রবেশ করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার বা ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হতে পারে।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস জানিয়েছেন, গত জুনের ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের আঘাত হেনেছিল। এরপর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চালিয়ে ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, এই সামরিক অভিযানের ফলে ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই স্পষ্ট করে জানিয়েছেন—ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।
একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না এবং এটাই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে, সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষক এরিক ব্রুয়ার মনে করেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার না দেওয়ায় ইরানের সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। তার মতে, ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক উপাদানগুলো এত গভীরে লুকিয়ে রেখেছে যে প্রচলিত বোমা ব্যবহার করে সেগুলো ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।
তিনি আরও বলেন, এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি স্থল অভিযান চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সেটিই হয়তো একমাত্র কার্যকর উপায় হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে, ইসরাইলের পক্ষ থেকে ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য করে গুপ্তহত্যার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জাতিসংঘের সাবেক পরমাণু পরিদর্শক এবং ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রধান ডেভিড অলব্রাইট মনে করেন, এসব হত্যাকাণ্ড ইরানের জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তার মতে, বিজ্ঞানীদের হারানোয় ইরানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হতে পারে। তবে তবুও যদি তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়, তাহলে সেই অস্ত্রের কার্যকারিতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। যদিও সামরিক চাপ অব্যাহত রয়েছে, তবুও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি।
সব মিলিয়ে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। সামরিক অভিযান, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চাপ—সবকিছুর মধ্যেই তেহরান তার অবস্থান ধরে রেখেছে। ভবিষ্যতে এই সংকট কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।