খুলনার দাকোপ উপজেলায় প্রেমিকার পরিবারের হাতে মারধর ও লাঞ্ছনার অভিযোগে মিঠুন গাইন (২৭) নামে এক যুবকের আত্মহত্যার ঘটনায় অবশেষে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল মিঠুনের মা তরুলতা গাইন বাদী হয়ে খুলনা বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনজনকে আসামি করে (সিআর ৮৬/২৬) এই মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে দাকোপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার বিবরণী অনুযায়ী, দাকোপ উপজেলার সাহেবের আবাদ গ্রামের প্রসাদ রায়ের কন্যা সীমান্তি রায়ের সঙ্গে মিঠুন গাইনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক মেনে নিতে না পেরে প্রসাদ রায় ও তার স্ত্রী শংকরী রায় দীর্ঘদিন ধরে মিঠুনকে অপমান ও হুমকি দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত ১৫ এপ্রিল আসামিরা একজোট হয়ে প্রকাশ্যে মিঠুনকে বেধড়ক মারধর ও জুতা দিয়ে পেটায়। এ সময় তাকে চরমভাবে লাঞ্ছিত করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের ভয় দেখিয়ে মিঠুনকে বিচার না চাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয় বলেও অভিযোগ ওঠে।
পরিবারের দাবি, এই অপমান ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে গত ২১ এপ্রিল দুপুরে নিজ বাড়িতে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন মিঠুন গাইন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
মিঠুনের পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা গ্রহণ না করে একটি অপমৃত্যুর ডায়েরি (ইউডি) নথিভুক্ত করে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত প্রসাদ রায় মিঠুনের পরিবারের বিরুদ্ধে দোকান ভাঙচুরের মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন বলেও দাবি করেন তারা।
মিঠুনের মৃত্যুর পর অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্থানীয় সচেতন গ্রামবাসী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এতে অংশ নিয়ে এলাকাবাসী দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
গত মঙ্গলবার রাতে খুলনা-১ আসনের সাবেক এমপি প্রার্থী ও জামায়াত নেতা কৃষ্ণ নন্দী শোকসন্তপ্ত মিঠুনের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তাদের বাড়িতে যান। এ সময় মিঠুনের মা কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রভাবশালীদের ভয়ে ন্যায়বিচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। কৃষ্ণ নন্দী তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, মিঠুনকে আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীদের আইনের আওতায় আনতে সব ধরনের আইনি ও সামাজিক সহযোগিতা করা হবে।
এ বিষয়ে দাকোপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) প্রকাশ বোস বলেন, “আদালতের নির্দেশনাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে থানায় পৌঁছায়নি। নথিপত্র হাতে পাওয়া মাত্রই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, প্রায় ১০ বছর আগে বাবা ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই সংগ্রামী মা তরুলতা গাইনের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন মিঠুন। চরম দারিদ্র্যের কারণে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের পর তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্থানীয় ব্লাড ডোনার ক্লাবসহ বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। একজন পরোপকারী যুবকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।