ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ এবং বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার একটি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউস এমনটাই মনে করছে বলে জানা গেছে। দুজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তথ্যসূত্র হিসেবে এক্সিওস-এর প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে ইরানের আনুষ্ঠানিক জবাব প্রত্যাশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তা সত্ত্বেও দুই পক্ষ বর্তমানে যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে।
সমঝোতার খসড়া অনুযায়ী, ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে এবং আটকে থাকা কয়েক শ কোটি ডলার অর্থ ছাড় দেবে।
এছাড়া উভয় পক্ষই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হবে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি বিশ্ব জ্বালানি ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
তবে এই সমঝোতা স্মারকের অনেক শর্তই চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভর করছে। ফলে আবারও যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা বা দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্মুখযুদ্ধ থামলেও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত নয়, এবং পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আবারও জটিল হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভিন্ন অংশে বিভক্ত। ফলে দেশটির অভ্যন্তরে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হতে পারে। এমনকি প্রাথমিকভাবে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও কিছু মার্কিন কর্মকর্তার মধ্যে সংশয় রয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন দফার আলোচনা এবং চলমান সংঘাতের সময় মার্কিন কর্মকর্তারা একাধিকবার চুক্তির ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানের ঘোষণা থেকে সরে এসেছেন। আলোচনায় অগ্রগতির কারণেই তিনি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তারা উল্লেখ করেন।
নেপথ্যের তথ্য অনুযায়ী, এক পৃষ্ঠার এই ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক নিয়ে বর্তমানে বিস্তারিত দর–কষাকষি চলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সমঝোতা কার্যকর হলে এই অঞ্চলে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করা হবে। এরপর শুরু হবে ৩০ দিনের নিবিড় আলোচনা, যেখানে হরমুজ প্রণালী পুনরায় সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি করার চেষ্টা চলবে। দুটি সূত্র জানায়, এই আলোচনা ইসলামাবাদ অথবা জেনেভায় অনুষ্ঠিত হতে পারে। আলোচনার এই স্থান এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ৩০ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে হরমুজ প্রণালিতে থাকা বিধিনিষেধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও অবরোধ আরোপ করতে পারবে, এমনকি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও থাকবে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার মেয়াদ নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় বিতর্ক চলছে। তিনটি সূত্র জানায়, এটি অন্তত ১২ বছরের জন্য হতে পারে। তবে একটি সূত্র বলছে, মেয়াদ ১৫ বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ইরান শুরুতে ৫ বছরের প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের অবস্থানে অনড় ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে এমন একটি ধারা যুক্ত করতে চায়, যেখানে ইরান নিয়ম ভঙ্গ করলে স্থগিতাদেশের মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে। পাশাপাশি এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ইরানকে মাত্র ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত নিম্নমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং কোনো ধরনের অস্ত্র উন্নয়নমূলক কার্যক্রমেও যুক্ত হবে না। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পরিচালনা বন্ধের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরান কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থার আওতায় থাকতে রাজি হতে পারে। এতে জাতিসংঘের পরিদর্শকেরা যেকোনো সময় আকস্মিকভাবে ইরানি স্থাপনায় পরিদর্শন করতে পারবেন। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং বিশ্বব্যাপী আটকে থাকা ইরানের শত শত কোটি ডলার অর্থ মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেবে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, ইরান তাদের কাছে থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরিয়ে নিতে সম্মত হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান শর্ত। এমনকি এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “আমাদের এক দিনে মূল চুক্তি লিখে ফেলার কোনো প্রয়োজন নেই। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল ও কৌশলগত।” তিনি আরও বলেন, আলোচনায় শুরুতেই ইরান কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। তবে তিনি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজনকে নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেন এবং চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।
আকাশজমিন /
আরআর