উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি : / : 70
রাজশাহী প্রতিনিধি
বরেন্দ্র অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র পানি সংকট চলমান থাকলেও এখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও জয়পুরহাট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষি, জীবনযাত্রা এবং পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে গভীর সংকট। সরকারি পর্যায়ে একে ‘সংকটাপন্ন অঞ্চল’ ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, কম বৃষ্টিপাত, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে বরেন্দ্র অঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগোচ্ছে। প্রায় এক কোটি মানুষ সরাসরি এই পানিসংকটে ভুগছেন বলে বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে উঠে এসেছে।
গত বছর ২৪ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় বরেন্দ্র অঞ্চলের ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের প্রায় ৪ হাজার ৯১১টি মৌজা এবং সাড়ে পাঁচ হাজার গ্রামকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পানিসংকট এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫০৩টি মৌজাকে অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে ৬ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করে বলা হয়, খাওয়ার পানি ছাড়া ১০ বছরের জন্য এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকবে।
২০১৩ সালের পানি আইন অনুযায়ী, এসব এলাকায় সেচ ও শিল্পকারখানায় গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অমান্য করলে শাস্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ খুবই দুর্বল বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
গবেষকদের মতে, নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে মাটির নিচের পানিধারক স্তর বা অ্যাকুইফার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে বৃষ্টিপাত হলেও পানি মাটির নিচে সংরক্ষণ হচ্ছে না। এতে সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং বিস্তীর্ণ জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে।
ওয়াটার রিসোর্সেস প্ল্যানিং অর্গানাইজেশনের (ওয়ারপো) তথ্য অনুযায়ী, বরেন্দ্র অঞ্চলে দুই দশক আগেও পানির সংকট তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভয়াবহ। ১৯৮৫-৯০ সালে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল প্রায় ২৬ থেকে ৩০ ফুট নিচে। ২০০৪ সালে তা নেমে আসে ৫১ ফুটে, ২০১৩ সালে ৬০ ফুটে এবং ২০২১ সালে ৭০ ফুট ছাড়িয়ে যায়। ২০২৫ সালে অনেক এলাকায় পানির স্তর ৮০ থেকে ৯০ ফুটের নিচে নেমেছে। কিছু জায়গায় ২০০ ফুটেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে পানির স্তর ছিল ৩৯ ফুট নিচে। ২০১৬ সালে তা নেমে আসে ১১৮ ফুটে। বর্তমানে অনেক এলাকায় হস্তচালিত নলকূপেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবেশবিদদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চল দেশের সবচেয়ে উষ্ণ ও শুষ্ক এলাকায় পরিণত হয়েছে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়। প্রতি বছর গড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে বৃষ্টিপাতও ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
বিগত ৫০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিসেম্বর-জানুয়ারি ছাড়া প্রায় পুরো বছরই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১ হাজার ৪৯০ থেকে ১ হাজার ৭৪০ মিলিমিটার থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা ৩ থেকে ১৬ শতাংশ কমে গেছে। গবেষণা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বৃষ্টিপাত আরও ২৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, সরকারি বিধিনিষেধ থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। অনেকেই আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে সেচের কাজ করছেন। এতে পানির ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
তানোর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকার কৃষকেরা জানান, পানির সংকটের কারণে জমিতে সেচ দিতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে সেচ খরচ ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত গড়িয়েছে। নুয়ে পড়া ধানের ক্ষেত্রে এই খরচ আরও বাড়ছে।
অনেক জায়গায় শ্যালো ও গভীর নলকূপ একসঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে দ্রুত পানির স্তর নিচে নামছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি নির্দেশনায় যেখানে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০ নলকূপ থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে ৬২ হাজারের বেশি শ্যালো টিউবওয়েল ও হাজার হাজার গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এতটাই নিচে নেমেছে যে অনেক জায়গায় অ্যাকুইফার নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি আর জমা হচ্ছে না।
বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ সেচ কাজ ভূ-উপরিস্থ পানিতে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে স্থানীয় প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের মতে, খাসপুকুর ও জলাশয় পুনরুদ্ধার, অবৈধ নলকূপ বন্ধ এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়।
আকাশজমিন / আরআর