আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সোমবার প্রথমবার নবান্নে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করলেন শুভেন্দু অধিকারী। এদিন সচিবালয়ের ১৪ তলায় অনুষ্ঠিত হয় নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক। বৈঠকে সীমান্ত সুরক্ষা, সরকারি চাকরির বয়সসীমা বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় প্রকল্পে যুক্ত হওয়া, জনগণনা শুরু এবং প্রশাসনিক সংস্কারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে শপথ নেওয়া মন্ত্রীরা—দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, ক্ষুদিরাম টুডু ও নিশীথ প্রমাণিক। যদিও এখনও পর্যন্ত তাঁদের দপ্তর বণ্টন করা হয়নি।
সকাল থেকেই দলীয় একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেন মুখ্যমন্ত্রী। পরে সল্টলেকের দলীয় কার্যালয় থেকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নবান্নে পৌঁছান তিনি। সেখানে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘গার্ড অফ অনার’ দেওয়া হয়। এরপর রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, ডিজিপি ও কলকাতার পুলিশ কমিশনারসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন শুভেন্দু। বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈঠকের ছবি প্রকাশ করে শুভেন্দু অধিকারী লেখেন, রাজ্যের নাগরিকদের নিরাপত্তা, সুশাসন ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করবে। তিনি বলেন, দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও জনমুখী প্রশাসন গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা। সংবাদ সম্মেলনে শুভেন্দু অধিকারী জানান, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে ভূমি ও রাজস্ব দপ্তরের সচিব এবং মুখ্যসচিবকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, আগের সরকার সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। বিএসএফ যতটা জমি চেয়েছে, ততটাই দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে শুভেন্দু বলেন, পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস বদলে গেছে এবং সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তিনি আরও বলেন, প্রথম দিনেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিএসএফকে জমি হস্তান্তরে অনুমোদন দিয়েছে রাজ্য সরকার।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত হলো কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুক্ত হওয়া। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রকল্পে রাজ্য সরকার অংশ নেয়নি, এবার সেগুলোতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী জানান, প্রধানমন্ত্রী জনআরোগ্য যোজনা, ‘আয়ুষ্মান ভারত’, প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও এবং প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা ৩.০–এর মতো প্রকল্পে রাজ্য সরকার অংশ নেবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য সচিব, মুখ্যসচিব এবং মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের উপদেষ্টাদের দ্রুত এ বিষয়ে কার্যক্রম সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুভেন্দু আরও জানান, উজ্জ্বলা যোজনার আওতায় ৮ লাখ ৬৫ হাজার আবেদন আগের সরকার কেন্দ্রের কাছে পাঠায়নি। নতুন সরকার সেই আবেদনগুলো পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এছাড়া ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার এখনও পুরোনো সিআরপিসি ও আইপিসি অনুযায়ী প্রশাসন চালাচ্ছিল। নতুন সরকার সংবিধানসম্মত পদ্ধতিতে প্রশাসনিক সংস্কার করবে বলে জানান তিনি।
সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের জন্যও বড় ঘোষণা এসেছে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে। সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা পাঁচ বছর বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ২০১৫ সালের পর রাজ্যে সরকারি চাকরিতে কার্যত কোনো নিয়োগ হয়নি। ফলে বহু শিক্ষিত যুবক-যুবতীর চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে গেছে। সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই চাকরির বয়সসীমা পাঁচ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিন ধরে চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া বহু প্রার্থী উপকৃত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা বয়সসীমা অতিক্রম করায় আবেদন করতে পারছিলেন না, তাদের জন্য এটি বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিন জনগণনা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৬ জুন ২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জনগণনার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে চিঠি পাঠালেও আগের সরকার বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছিল।
শুভেন্দুর অভিযোগ, জনগণনা আটকে দিয়ে আগের সরকার শুধু রাজ্যের সঙ্গেই নয়, দেশের সংবিধানের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তিনি জানান, সোমবার থেকেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার জনগণনার কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই বিজেপির নিহত ৩২১ কর্মীর প্রসঙ্গ তুলে আবেগঘন বক্তব্য দেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, এই সরকার ৩২১ জন নিহত বিজেপি কর্মীর পরিবারের পাশে থাকবে। তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই এই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নিহতদের পরিবার বিচার চায় এবং সরকার সেই বিচার নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি নিহতদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ডবল ইঞ্জিন সরকার দলমত নির্বিশেষে সবার জন্য কাজ করবে। ভয়মুক্ত ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনের জন্য ভোটকর্মী, গণনাকর্মী, রাজ্য পুলিশ, কলকাতা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান শুভেন্দু।
সোমবার নবান্নে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। দুপুর ১টার দিকে ২৩ জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন তিনি। সেখানে জেলার প্রশাসনিক পরিস্থিতি, উন্নয়ন কার্যক্রম ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনা হয়। পরে বিকেল ৪টায় বিজেপির জয়ী প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করার কথাও জানান তিনি।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া সংকল্পপত্রের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরবর্তী মন্ত্রিসভার বৈঠকেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
সরকার পরিচালনার দর্শন তুলে ধরে শুভেন্দু বলেন, এই সরকার ‘আমিত্বে’ বিশ্বাস করে না, বরং ‘আমরা’ নীতিতে চলবে। তিনি দাবি করেন, এমনভাবে সরকার পরিচালনা করা হবে যাতে সমালোচনার সুযোগ না থাকে।
একই সঙ্গে তিনি আগের সরকারের সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান সরকার প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত এবং স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিজেপি সরকারের এই প্রথম প্রশাসনিক বৈঠক ঘিরে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রথম দিনেই সীমান্ত নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় প্রকল্প, চাকরির বয়স বৃদ্ধি ও জনগণনার মতো ইস্যুতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসনিক তৎপরতার বার্তা দিয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আকাশজমিন / আরআর