আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়, গাজীপুর জেলা পরিষদ বর্তমানে প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন সিনিয়র সিটিজেন ও গাজীপুর জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে আবেদনকারী দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং আর্থিক অনিয়ম চলমান রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিভিন্ন প্রকল্প, টেন্ডার ও প্রশাসনিক ফাইল প্রসেসিংয়ের ক্ষেত্রে ঘুষ বাণিজ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে আবেদনপত্রে দাবি করা হয়, একটি নির্দিষ্ট ঘুষ কাঠামো অনুসরণ করা হয় এবং বড় অঙ্কের প্রকল্প ছাড়া ফাইল অনুমোদন প্রক্রিয়া অগ্রসর হয় না।
আবেদনপত্রে একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, “৭৫ লক্ষ টাকার নিচে কোনো ফাইল আমার টেবিলে ওঠে না”—এমন বক্তব্যের মাধ্যমে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ঘুষের ন্যূনতম সীমা নির্ধারণের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এই বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গাজীপুর জেলা পরিষদের আওতাধীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প—বিশেষ করে সড়ক, ড্রেন, কালভার্ট ও অবকাঠামো নির্মাণ কাজে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কমিশন বাণিজ্য এবং নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় ঘটছে বলে দাবি করা হয়।
আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়, এসব অনিয়মের কারণে প্রকল্পের গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং স্থানীয় জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়ের একটি বড় অংশ অনৈতিকভাবে আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
এছাড়া জেলা পরিষদের ভেতরে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদার পরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ করছে। কেউ এই অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে হয়রানি, চাপ প্রয়োগ বা মামলা-হামলার হুমকি দেওয়া হয় বলেও আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনকারী নিজেকে আব্দুল কাইয়ুম খান, সাবেক প্রতিষ্ঠান প্রধান, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আসছেন এবং বিভিন্ন সময় অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দিয়েছেন।
তিনি আবেদনপত্রে উল্লেখ করেন, পূর্বে গুলিস্তান কমপ্লেক্স সংক্রান্ত কয়েক শত কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে ৪টি ফৌজদারি ও ৫টি বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। এর ফলে তিনি দীর্ঘ সময় সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় ছিলেন বলেও দাবি করেন।
আবেদনপত্রে তিনি বলেন, নিজ জন্মস্থান গাজীপুরে প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অনিয়মের বিস্তার তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। তিনি মনে করেন, স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সাধারণ জনগণ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।
আবেদনপত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং অডিট অধিদপ্তরের কাছে পৃথকভাবে কয়েকটি সুপারিশ ও প্রার্থনা জানানো হয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—গাজীপুর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ, ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা।
এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘুষ বাণিজ্য সংক্রান্ত অভিযোগ, বিশেষ করে প্রশাসনিক ফাইল অনুমোদনে অনিয়মের বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অডিট অধিদপ্তরের মাধ্যমে জেলা পরিষদের বিগত পাঁচ বছরের সকল উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার কার্যক্রম ও আর্থিক লেনদেনের বিশেষ অডিট পরিচালনার দাবিও জানানো হয়।
আবেদনপত্রে আরও বলা হয়, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা, বিভাগীয় মামলা এবং ফৌজদারি মামলা দায়ের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আবেদনকারীর মতে, গাজীপুর জেলা পরিষদ জনগণের উন্নয়ন ও কল্যাণে গঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হলেও সেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতি চলতে থাকলে জনআস্থা নষ্ট হবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।
তিনি বলেন, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি সরকারের কাছে এই বিষয়ে দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করেন, যাতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং উন্নয়ন কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হয়।
আবেদনপত্রের শেষাংশে বলা হয়, বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হলে গাজীপুর জেলা পরিষদে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আকাশজমিন
/ আরআর