আধুনিক নার্সিং সেবার পথিকৃৎ Florence Nightingale-এর নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক নারী, যিনি হাতে লণ্ঠন নিয়ে হাসপাতালের অন্ধকার করিডরে আহত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নামে।
১৮৫৪ সালের ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ইউরোপকে রক্তাক্ত করে তুলেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের জন্য তৈরি ব্রিটিশ সামরিক হাসপাতালগুলো ছিল ভয়াবহ অস্বাস্থ্যকর। সংক্রমণ, নোংরা পরিবেশ ও অপর্যাপ্ত চিকিৎসার কারণে আহতদের চেয়েও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছিল রোগে। ঠিক সেই সময় মানবিকতার আলো হয়ে সামনে আসেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল।
তিনি লণ্ঠন হাতে হাসপাতালের এক শয্যা থেকে আরেক শয্যায় ঘুরে ঘুরে আহত সৈনিকদের সেবা দিতেন। সেই দৃশ্যই তাকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। মানবসেবার প্রতি তার নিবেদন শুধু একজন নার্সের দায়িত্ব ছিল না, ছিল মানবতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
১৮২০ সালের ১২ মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে জন্মগ্রহণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। যদিও তার পরিবার ছিল লন্ডনের বাসিন্দা। জন্মের সময় তার বাবা-মা ইতালি সফরে ছিলেন। সেই শহরের নাম অনুসারেই তার নাম রাখা হয় ফ্লোরেন্স।
সেই সময় ইউরোপে শিল্পবিপ্লব ও বিজ্ঞানচর্চা এগিয়ে গেলেও হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। অনেক হাসপাতালই ছিল মৃত্যুর অপেক্ষাঘরের মতো। দুর্গন্ধ, অপরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণে ভরা সেই পরিবেশে সম্ভ্রান্ত পরিবারের এক তরুণীর নার্স হওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল একপ্রকার সামাজিক বিপ্লব।
১৮৫১ সালে জার্মানিতে নার্সিং প্রশিক্ষণ শুরু করেন ফ্লোরেন্স। পরে ১৮৫৩ সালে লন্ডনের একটি প্রতিষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই সময় ইউরোপীয় সমাজে নার্সিং পেশাকে নিচু শ্রেণির কাজ হিসেবে দেখা হতো। অভিজাত পরিবারের নারীরা সাধারণত এ পেশায় আসতেন না। কিন্তু ফ্লোরেন্স প্রচলিত ধারণা ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়েন।
তিনি একবার লিখেছিলেন, “আমি এমন একটি স্থায়ী পেশায় নিয়োজিত হতে চাই, যা করার মধ্যে সত্যিকারের সার্থকতা আছে।” তার এই ভাবনা থেকেই বোঝা যায়, বিলাসী জীবনের চেয়ে মানুষের সেবাকেই তিনি জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল শুধু নার্স ছিলেন না, তিনি ছিলেন দক্ষ সংগঠক ও পরিসংখ্যানবিদও। হাসপাতালের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়নে তিনি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কাজ করতেন। তার বিখ্যাত উক্তি— “হাসপাতালের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি যেন রোগীর কোনো ক্ষতি না করে।” আজও বিশ্বের বহু হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এই দর্শন অনুসরণ করা হয়।
১৯০৭ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অব মেরিট’ লাভ করেন। ১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন এই মহীয়সী নারী।
বিশ্বখ্যাত কবি Henry Wadsworth Longfellow তার ‘সান্তা ফিলোমেনা’ কবিতায় লিখেছিলেন, “A Lady with a Lamp shall stand/In the great history of the land.” এই পঙ্ক্তি শুধু প্রশংসা নয়, মানবতার প্রতি তার অবদানের স্বীকৃতি।
আজও হাসপাতালের নীরব করিডরে, অসুস্থ মানুষের কষ্টের মুহূর্তে কিংবা একজন নার্সের মানবিক স্পর্শে যেন ফিরে আসে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের স্মৃতি। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক পৃথিবীতেও অসুস্থ মানুষ শেষ পর্যন্ত আরেকজন মানুষের স্নেহময় স্পর্শই খোঁজে। আর সেই মানবিক স্পর্শের ইতিহাস হয়ে আছেন ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল।