ইরানের বিরুদ্ধে গোপনে সামরিক হামলা চালিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)— এমন বিস্ফোরক দাবি প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশ নেওয়া একমাত্র আরব দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে আমিরাত।
সোমবার (১২ মে) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এসব হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল পারস্য উপসাগরে অবস্থিত লাভান দ্বীপের একটি তেল শোধনাগার।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দাবি, ওই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে হামলাটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগে না পরে সংঘটিত হয়েছে— সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হামলার পর ইরান একটি নির্দিষ্ট স্থাপনায় ‘অজ্ঞাত শত্রুর’ হামলার কথা স্বীকার করেছিল। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের বিরুদ্ধে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগও সামনে আসে। যদিও পুরো যুদ্ধজুড়ে আমিরাতের সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবুও লাভান দ্বীপে হামলাকে দেশটির সরাসরি অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করলেও আবুধাবি ভিন্ন অবস্থান নেয়। এ কারণে ওয়াশিংটন আমিরাতের ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
তবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা আগের এক বিবৃতির প্রসঙ্গ টেনে জানায়, ইরানের হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। একইভাবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনও এ বিষয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গেছে।
এর আগে গত মার্চ মাসে কয়েকটি ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের হামলার জবাবে ইরানের একটি পানি শোধনাগার প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছিল আমিরাত। যদিও সে সময় আবুধাবি এসব অভিযোগ ‘মিথ্যা’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সেই ঘটনার বিষয়ে নতুন করে আলোচনা সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় আমিরাতের এই গোপন ভূমিকা নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে। কারণ এতদিন উপসাগরীয় দেশগুলো সাধারণত ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনায় সরাসরি সামরিক জড়িত হওয়া এড়িয়ে চলত। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাণিজ্য ও কৌশলগত স্বার্থের প্রশ্নে নতুন অবস্থান নিচ্ছে কয়েকটি দেশ।
যুদ্ধ চলাকালে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৫৫০টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং ২ হাজার ২০০-এর বেশি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। এতে সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ফলে যুদ্ধের সময় অঞ্চলটির সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয় আরব আমিরাত। বিভিন্ন স্থানে তেল স্থাপনা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার কারণে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি চাপে পড়ে।
ইরান যুদ্ধ চলাকালে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও হামলার হুমকি দিয়েছিল। পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি অবরোধেরও হুমকি দেয় তেহরান। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ দেখা দেয়।
যদিও অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করা হয়েছিল, তবুও কিছু হামলায় সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যায়।
অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করেছে, ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা এবং দেশটির সামরিক অবকাঠামো ভেঙে দিতেই যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সেই লক্ষ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে মত দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। বরং যুদ্ধ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে আরও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন সামরিক জোট ও গোপন সহযোগিতার বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আমিরাতের সম্পৃক্ততার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়, তবে তা ইরান-উপসাগরীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের কূটনৈতিক ভারসাম্যেও নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।