খুলনার দাকোপ উপজেলার পশুর নদী তীরবর্তী ঐতিহ্যবাহী বাণীশান্তা যৌনপল্লি এখন উদ্বেগজনকভাবে মাদকের বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলা মদ ও গাঁজার পাশাপাশি সর্বনাশা ইয়াবার বিস্তার বাড়তে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাইরের প্রভাবশালী কিছু মাদক কারবারি প্রান্তিক নারীদের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট। এর প্রভাবে স্থানীয় উঠতি বয়সী যুবকদের একটি অংশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, যৌনপল্লির অভ্যন্তরে এখন আর মাদক সীমিত পরিসরে নেই। ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে ইয়াবা বিক্রির একটি সক্রিয় নেটওয়ার্ক। অভিযোগ রয়েছে, বাইরের বড় মাদক ব্যবসায়ীরা যৌনপল্লিটিকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে। সাধারণ খদ্দেরের আড়ালে মাদক কারবারিরা নিয়মিত যাতায়াত করছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লির এক নারী বাসিন্দা বলেন, “আগে শুধু মদ-গাঁজা চলত, এখন ঘরে ঘরে ইয়াবা পৌঁছে গেছে। আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়। গরিব মেয়েদের ব্যবহার করে অন্যরা লাভবান হচ্ছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, যৌনপল্লি এলাকাটি কিছুটা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় এবং সেখানে মানুষের যাতায়াত বেশি থাকায় মাদকসেবীরা এটিকে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে বিকেলের পর থেকে পল্লির আশপাশে অপরিচিত যুবকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এতে স্থানীয় পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
দাকোপ উপজেলার কয়েকজন অভিভাবক জানান, এলাকার কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ সহজেই মাদকের সংস্পর্শে চলে যাচ্ছে। এর ফলে চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতার ঘটনাও বাড়ছে বলে অভিযোগ তাদের। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তারা।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, কেবল অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া স্থায়ী সমাধান আসবে না। তাদের মতে, মাদকের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবহেলা, দারিদ্র্য, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের কারণে অনেক যৌনকর্মী মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র তাদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে একদিকে তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে আইনি জটিলতা ও সামাজিক নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছেন।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, যৌনপল্লিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে মাদকের বিস্তার ঘটলেও দৃশ্যমানভাবে বড় ধরনের অভিযান খুব কম দেখা যায়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বিষয়টি তাদের নজরদারিতে রয়েছে।
এ ব্যাপারে দাকোপ থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) প্রকাশ বোস বলেন, “থানা এলাকাকে মাদকমুক্ত রাখতে আমাদের বিশেষ অভিযান নিয়মিত চলমান রয়েছে। বিশেষ করে বাণীশান্তা যৌনপল্লিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মাদক সিন্ডিকেটের ওপর আমাদের কড়া নজরদারি রয়েছে। তবে তাদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুকৌশলী হওয়ায় অনেক সময় পুলিশের উপস্থিতির খবর তারা আগেই পেয়ে যায়, যা অভিযানে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।”
তিনি আরও বলেন, “পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই সেখানে বড় পরিসরে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাসহ কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ছিঁচকে বিক্রেতাদের আটক করলেই হবে না, বরং নেপথ্যে থাকা মূল মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি যৌনপল্লির নারীদের পুনর্বাসন, সচেতনতা কার্যক্রম ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
তাদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে বাণীশান্তা যৌনপল্লিকে ঘিরে গড়ে ওঠা মাদক নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে পুরো দাকোপ উপজেলার সামাজিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।