যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত দুই দিনের গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ শেষে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েল ও লেবানন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র টমি পিগোট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত সংলাপ অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে আরও ৪৫ দিন করা হয়েছে।
এই সংলাপের মধ্য দিয়ে কয়েক দশক পর ইসরায়েল ও লেবাননের সরকারি পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। আলোচনায় দুই দেশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও অংশ নেন।
গত ২ মার্চ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী। এর কয়েক দিন আগে ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর পর পুরো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়। ইসরায়েল দাবি করে, লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে দুর্বল করতেই তারা এই অভিযান চালিয়েছে।
দীর্ঘ দেড় মাসের সংঘাতে দক্ষিণ লেবাননে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২ হাজার ৮১৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১২ হাজারের বেশি মানুষ। এছাড়া নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন ১০ লাখেরও বেশি লেবাননের নাগরিক।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পুরোপুরি থেমে থাকেনি সংঘাত। গত এক মাসে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দফা হামলার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে। এসব হামলায় কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিকও নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তারা জীবিকার সন্ধানে লেবাননে গিয়েছিলেন।
ওয়াশিংটনের সংলাপে শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, আগামী ২৯ মে’র মধ্যে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে একটি নতুন ‘নিরাপত্তা লাইন’ প্রস্তাব করবেন। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহে আবারও বৈঠকে বসবেন ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিরা। সেই বৈঠকও ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
টমি পিগোট বলেন, দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি তৈরি, পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সংলাপ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান আলোচনা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে সহায়ক হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েল, লেবানন, ইরান ও বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীকে ঘিরে সংঘাতের আশঙ্কা প্রায়ই বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির এই সময়কে কাজে লাগিয়ে যদি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংলাপ এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে সংঘাতপূর্ণ সীমান্ত পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
এদিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে না পড়ে স্থায়ী শান্তির পথে এগোবে দুই দেশ। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননের বাস্তুচ্যুত মানুষেরা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে মানবিক সহায়তা এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমও এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
সূত্র: Reuters