উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি : / : 85
সরকারের দেওয়া বিভিন্ন কার্ডের তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, ‘জনগণের পকেটে থাকা কার্ডে যদি টাকা না আসে, তাহলে আমরাও একটা নতুন কার্ড বানাব—যার নাম হবে লাল কার্ড। আর এই লালকার্ডটা আমরা সরাসরি সরকারের হাতে ধরিয়ে দেব।’ শনিবার (১৬ মে) দুপুরে রাজশাহী জেলা পরিষদ মিলনায়তনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে নেতাকর্মীদের এনসিপিতে যোগদান অনুষ্ঠানে দেওয়া এক জোরালো বক্তব্যে তিনি এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী ও আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘রাজশাহী থেকে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। যিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, আজকে ভাগ্যের চাকার পরিহাসে উনি গেছেন আমার জন্মস্থান চাঁদপুরে, আর আমি ওনার জন্মস্থান রাজশাহীতে এসে পড়েছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো চাঁদপুরেরও প্রকৃত উন্নয়ন হয় নাই, রাজশাহীরও আশানুরূপ উন্নয়ন হয় নাই। আমরা শুধু পেয়েছি কতগুলো কার্ড, যে কার্ডগুলো এখন কেবল পকেটে নিয়েই ঘুরতে হবে।’ সরকারকে কড়া বার্তা দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে যদি আপনি দ্রুত রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না করেন, তাহলে এ দেশে আপনার ক্ষমতার গদি টিকে থাকবে কি না, সেই নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি না। কারণ, দেশের সাধারণ জনগণ আপনাকে ম্যান্ডেট ও ভোট দিয়েছে। এই জনগণের ভোটের বাক্সে যদি এখন কেউ নতুন করে লাথি মারতে চায়, তবে আমরাও রাজপথে দাঁড়িয়ে তার ক্ষমতার গদিতে লাথি মারতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করব না।’
আওয়ামী লীগের তৎপরতা ও বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এই এনসিপি নেতা বলেন, ‘শেখ হাসিনা এখন বিভিন্ন দিক থেকে উঁকিঝুঁকি মারছেন এবং আওয়ামী লীগও দেশের বিভিন্ন জায়গায় গোপনে মিছিল নামাচ্ছে। আমরা সরকারকে স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ার করে বলতে চাই—যদি শেখ হাসিনা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বাংলাদেশে পুনরায় ফেরত আসতে পারেন, তাহলে তারা প্রথম কোপ বা প্রথম গুলিটা চালাবে খোদ তারেক রহমানের ওপরে। তারেক রহমানের এই নির্মম রাজনৈতিক ইতিহাস ভালোভাবে জানা উচিত। অতীতে সেই কুচক্রী মহলই কিন্তু মেজর জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। যদি উনি এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেন, তাহলে তাঁর বাপের যে করুণ পরিণতি হয়েছিল, একই পরিণতি সন্তানেরও হতে পারে। এই জন্য তারেক রহমানকে আমরা স্পষ্ট বলব—ডোন্ট ডু কম্প্রোমাইজ উইথ আওয়ামী লীগ (আওয়ামী লীগের সাথে কোনো আপস করবেন না)। আমরা কিন্তু স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে একই ফ্রন্টে যুদ্ধ করছি। কিন্তু আপনারা যদি আপস করেন, তবে আমাদের ফ্রন্টিয়ার লাইন দুটি আলাদা হয়ে যাবে। তখন আমরা কিন্তু একই পাল্লায় বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে রাখতে সামান্যতম দ্বিধা করব না।’
ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, ‘আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে রাজশাহী থেকে ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি বড় প্রতিরোধ যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এই দিবসে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ভারতের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন—পানির ন্যায্য অধিকার আমরা কখনই ছাড়ব না। সেই ভাসানীর যে রাজনৈতিক মার্কা ছিল, তা বিএনপি কার্যত চুরি করে আজকে ভারতের বিরুদ্ধে একটি নতজানু ও দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করেছে। যদি তোমরা ভাসানীর মার্কা ব্যবহার করতে পার, তাহলে মওলানা ভাসানীর সেই আপসহীন নীতিও তোমাদের ধারণ করতে হবে। আর তা না পারলে অবিলম্বে ভাসানীর মার্কা ও আদর্শ আমাদের কাছে ফেরত দাও।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ভারতে বসে থাকা বা ভারতকেন্দ্রিক যে অপশক্তি রয়েছে বাংলাদেশে, তাদের সিভিল ফরমেট হলো আওয়ামী লীগ। এই শক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের কম্প্রোমাইজ করা চলবে না। যদি দাবি করেন সবার আগে বাংলাদেশ, তাহলে সীমান্তে প্রতিনিয়ত আমাদের দেশের মানুষ কীভাবে খুন হয়?’
তিস্তা ও পদ্মা নদীর পানির অধিকার নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে এনসিপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘নদীতে পানি না রেখে এরা আমাদের উল্টো সায়েন্স বা বিজ্ঞান বোঝাচ্ছে এবং খাল খননের অসার সমালোচনা করছে। যদি খাল খনন করতেই হয়, তাহলে তো আগে মূল নদীতে ভারতের কাছ থেকে পানি নিয়ে আসতে হবে। এখন যদি ভারতের সামনে গিয়ে আপনারা নমো নমো বা নতজানু পররাষ্ট্রনীতি শুরু করেন, তাহলে কি আমাদের পানির অধিকার আদায় হবে? এই জন্য সরকারকে রাজপথ থেকে কড়া ভাষায় বলব, রাজশাহীবাসীর মরা নদীতে আমরা অবিলম্বে পানির ন্যায্য হিস্যা চাই। আমাদের জীবন ও প্রকৃতি বাঁচাতে হলে পানির বিকল্প নেই। রাজশাহীবাসীকে আহ্বান জানাব—যদি পদ্মা নদীতে পানির অধিকার ফিরে না আসে, তবে আপনারা অধিকার আদায়ে ঢাকায় যাবেন এবং প্রয়োজনে ভারতের দিকে বিশাল লংমার্চ করবেন।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির এই বিশাল যোগদান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির রাজশাহী মহানগরের আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলী। এ সময় মঞ্চে অন্যান্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন দলটির উত্তরাঞ্চলের মূখ্য সংগঠক সারজিস আলম, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব এ বি এম গাজী সালাউদ্দিন আহমেদ, অন্যতম যুগ্ম সদস্য সচিব এসএম সাইফ মোস্তাফিজ, সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান ইমন এবং জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিন প্রমুখ। পুরো অনুষ্ঠানটি সফলভাবে পরিচালনা করেন এনসিপির রাজশাহী মহানগরের সদস্যসচিব আতিকুর রহমান।