আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ায় আগামী সপ্তাহেই ইরানের ওপর নতুন নামে বড় ধরনের যৌথ সামরিক হামলা চালাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর গুরুত্বপূর্ণ চীন সফর শেষে গত শুক্রবার দেশে ফিরেছেন। তিনি দেশে ফেরার পর এখন ইরান নিয়ে অত্যন্ত বড় ধরনের কিছু সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ট্রাম্প আরও বেশি বোমা মেরে বিদ্যমান এই বৈশ্বিক অচলাবস্থা ভাঙার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এমনটা মাথায় রেখেই ইরানে আবার নতুন করে অভিযান শুরু করতে ইতিমধ্যেই পেন্টাগনের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টারা সব ধরনের যুদ্ধপরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছেন।
উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর শেষ চেষ্টা করছেন। তাঁরা ইরানকে বুঝিয়ে কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালি’ আবার খুলে দেওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এটা সফল হলে ট্রাম্প নিজেকে আন্তর্জাতিকভাবে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারবেন এবং সন্দিহান মার্কিন ভোটারদের বোঝাতে পারবেন যে, ইরানে এই অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী সামরিক অভিযান সফল ছিল। কিন্তু বেইজিং ছাড়ার পরপরই শুক্রবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানের পাঠানো সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটি দেখেছি। আর প্রথম বাক্যটিই যদি আমার পছন্দ না হয়, তবে আমি তা সরাসরি ফেলে দিই।’ ট্রাম্প জানান, তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ইরানের বিষয়ে কথা বলেছেন। চীন হচ্ছে তেহরানের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার, যারা মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে তিনি সি চিন পিংকে ইরানের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে বলেননি।
এই যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পকে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক এক দ্বিমুখী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যদিও এটি তাঁর জন্য বড় রাজনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তাঁকে বিষয়টি পার করে সামনে এগিয়ে যেতে উদ্গ্রীব বলে মনে হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। তিনি প্রায়ই যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বলেছিলেন, ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। পেন্টাগন আগামী দিনগুলোতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আবার শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করছে। গত মাসে প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর সাময়িকভাবে এ অভিযান স্থগিত করা হয়েছিল, তবে এবার এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো নামে শুরু হতে পারে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ সপ্তাহে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় স্পষ্ট করে বলেন, ‘প্রয়োজন হলে যুদ্ধ আরও তীব্র করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।’
মধ্যপ্রাচ্যের দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য জোরালো বিমান ও স্থল হামলা আবার শুরুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। চীন সফরের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগে গত মঙ্গলবার ট্রাম্পও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘তারা হয় একটি চুক্তিতে আসবে, না হয় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।’ মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্প আবার সামরিক হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নিলে ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আরও জোরালো বোমাবর্ষণ করা হবে। অন্য একটি বড় বিকল্প হতে পারে, মাটির গভীরে লুকিয়ে রাখা পারমাণবিক উপাদানগুলো ধ্বংস করতে মার্কিন ‘স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেস’ (বিশেষ অভিযান চালাতে দক্ষ বাহিনী) সরাসরি মাটিতে নামানো। বিশেষায়িত এই পদাতিক সেনাদের ইস্পাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে লক্ষ্য করে চালানো স্থল অভিযানে ব্যবহার করা হতে পারে। তবে সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এই বিকল্পে মার্কিন বাহিনীর বিপুল পরিমাণ প্রাণহানির বড় ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে ইরান সরকারও সর্বোচ্চ যুদ্ধাবস্থায় ফিরে যাওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘যেকোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত। আমরা সব ধরনের বিকল্পের জন্য প্রস্তুত; তারা বিস্মিত হবে।’ মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এই সপ্তাহে সিনেটের প্রতিরক্ষা উপকমিটিকে বলেছেন, ‘সামরিক কর্মকর্তারা আমাদের বেসামরিক নেতাদের জন্য বেশ কিছু বিকল্প প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ তিনি জানান, নির্দেশ পাওয়ার মাত্রই ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের অভিযান শুরু করতে ৫০ হাজারের বেশি সেনা, ২টি বিমানবাহী রণতরি, নৌবাহিনীর এক ডজনের বেশি ডেস্ট্রয়ার ও বহু যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরান ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালি বরাবর তাদের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রের মধ্যে ৩০টিরই পূর্ণ কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে, যা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও তেল ট্যাংকার চলাচলের ক্ষেত্রে বড় সামরিক হুমকি।