আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মারণব্যাধি ক্যানসার চিকিৎসায় এক বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী মাইলফলক স্পর্শ করল প্রতিবেশী দেশ ভারত। দেশটিতে ফুসফুসের ক্যানসার চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির মাত্র ৭ মিনিটের একটি বিশেষ ইনজেকশন চালু করেছে রোশ ফার্মা ইন্ডিয়া। ‘টিসেন্ট্রিক’ (Tecentriq) নামের এই অত্যাধুনিক ইনজেকশনটি বিশেষভাবে ‘নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার’ (NSCLC) রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাধারণত ক্যানসারের প্রচলিত চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপির জন্য রোগীদের হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে স্যালাইনের মাধ্যমে ধমনীতে ওষুধ নিতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও সময়সাপেক্ষ। তবে নতুন আবিষ্কৃত এই ইনজেকশনটি সরাসরি ত্বকের নিচে (Subcutaneous) প্রয়োগ করা হয়। যার ফলে সম্পূর্ণ থেরাপি প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে মাত্র সাত মিনিট। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রযুক্তির ফলে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘদিনের শারীরিক ভোগান্তি এক ধাক্কায় অনেক কমে যাবে এবং একই সাথে ক্যানসার হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর বাড়তি চাপও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা প্রান্তিক মানুষ এবং শয্যাশায়ী বয়স্ক রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত সুবিধাজনক ও আশীর্বাদস্বরূপ হতে পারে।
মেডিকেল সায়েন্সের তথ্যমতে, এই বিশেষ চিকিৎসায় ব্যবহৃত মূল ওষুধের জেনেরিক নাম হলো ‘অ্যাটেজোলিজুম্যাব’ (Atezolizumab)। এটি মানবশরীরের ‘পিডি-এল১’ (PD-L1) নামের একটি নির্দিষ্ট প্রোটিনকে ব্লক বা নিষ্ক্রিয় করে কাজ করে। সাধারণত ক্যানসার আক্রান্ত কোষগুলো এই পিডি-এল১ প্রোটিনটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার (Immune System) আড়ালে লুকিয়ে থাকে, যার ফলে শরীর ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে পারে না। এই ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রোটিনটি বন্ধ হয়ে গেলে শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্যানসার কোষগুলোকে সহজে শনাক্ত করতে পারে এবং সেগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়ে ধ্বংস করে দেয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, যেসব লাং ক্যানসার রোগীর টিউমারে পিডি-এল১ প্রোটিনের মাত্রা অনেক বেশি, তারা এই ইনজেকশন চিকিৎসা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকার পেতে পারেন। ধারণা করা হচ্ছে, নন-স্মল সেল লাং ক্যানসারে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক রোগীই এই নতুন চিকিৎসা গ্রহণের উপযোগী হতে পারেন।
তবে নতুন এই সফল চিকিৎসার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ও চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এর আকাশচুম্বী উচ্চ খরচ। ভারতে প্রতি ডোজ টিসেন্ট্রিক ইনজেকশনের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার ভারতীয় রুপি। ক্যানসারের তীব্রতা অনুযায়ী অনেক রোগীর ক্ষেত্রে পুরোপুরি সুস্থ হতে ছয়টি পর্যন্ত ডোজের প্রয়োজন হতে পারে। এর ফলে পুরো চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাধারণ রোগীদের এই খরচের ধকল কমাতে ইনজেকশন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রোশ ফার্মা ‘ব্লু ট্রি’ (Blue Tree) নামে একটি বিশেষ আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। এছাড়া ওষুধটি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্প ‘সিজিএইচএস’ (CGHS)-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে করে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির রোগী সরকারি আর্থিক অনুদান পেতে পারেন। ব্যয়বহুল হলেও দ্রুত চিকিৎসা এবং তুলনামূলক কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে এই প্রযুক্তিকে ক্যানসার চিকিৎসায় একটি বিশাল অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।