ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যুর ১১ মাস পর 'জুলাই শহীদ' বানিয়ে হত্যা মামলা, আসামি দুই সাংবাদিক!


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ১৯ মে, ২০২৬ সময় : ৪:১২ পিএম

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তুমুল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার খবরে লালমনিরহাটে যখন তীব্র বিজয় উল্লাস চলছিল, ঠিক তখন অন্যদের মতো আনন্দ মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন কোরআনের হাফেজ আজিজুল ইসলাম। দুপুরে মিছিলে গিয়ে দুর্ভাগ্যবশত বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়। নিহত আজিজুল ইসলাম লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ঝালঙ্গী গ্রামের আব্দুর রহিমের ছেলে। নিছক একটি দুর্ঘটনায় মারা গেলেও একদল অসাধু ব্যক্তি আজিজুলের এই মৃত্যুকে পুঁজি করে নিজেদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে পুরোপুরি উঠেপড়ে লাগে। তাঁর মৃত্যুর প্রায় ১১ মাস পর তিনি জুলাই শহীদ—এই মর্মে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

নিজেকে জুলাইযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে মোশাররফ হোসেন নামের এক ব্যক্তি এই মামলাটি করেন, যাতে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামি করা হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষকে। যদিও এই চাঞ্চল্যকর মামলা সম্পর্কে নিহতের পরিবার প্রথমে কিছুই জানত না। মামলার বাদীর সঙ্গে নিহত আজিজুলের রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই, এমনকি তিনি দূরসম্পর্কের কোনো আত্মীয়ও নন।

এদিকে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক मंत्रालय জুলাই শহীদদের নামের তালিকা সম্বলিত একটি বিশেষ গেজেট প্রকাশ করে। উপসচিব হরিদাস ঠাকুর স্বাক্ষরিত ওই গেজেটে দেখা যায়, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়া আজিজুল ইসলামের গেজেট নম্বর ৭১৮। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আজিজুল হত্যা মামলার বাদী ও হাতীবান্ধার বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পাটগ্রামের কাউয়ামারী বাজারে উপস্থিত থেকে আওয়ামী লীগ সরকার পতন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন।

তিনি এজাহারে দাবি করেন, ওই দিন ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাধাগ্রস্ত করতে স্থানীয় মোশাররফ হোসেন প্রধান কলেজের সামনে আসামিরা বাঁশের খুঁটিতে থাকা বৈদ্যুতিক তার ফেলে দিলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আজিজুল। বাদী এজাহারে আরও উল্লেখ করেন, নিহতের পরিবার-স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে এজাহার দায়ের করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।

মামলার নথি অনুযায়ী, মোশাররফের দায়ের করা এই মামলায় ৪৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ দুজন পেশাদার সাংবাদিককেও আসামি করা হয়েছে। মামলার ৩৪ নম্বর আসামি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আজিজুল হক দুলাল, যিনি দৈনিক ইত্তেফাকের পাটগ্রাম উপজেলা প্রতিনিধি এবং পাটগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। একই মামলায় ৪১ নম্বর আসামি করা হয়েছে সমকালের ওই উপজেলার সংবাদদাতা মামুন হোসেন সরকারকে।

মামলার আসামি হওয়ার পর এই দুই সাংবাদিক দীর্ঘ কয়েক মাস গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তদন্তে ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা ও কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় গত বছরের ১০ নভেম্বর ওই দুই সাংবাদিককে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানিয়ে আদালতে একটি অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আব্দুল জলিল। মিথ্যা মামলার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক আজিজুল হক দুলাল বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমি পাটগ্রাম পৌর শহরে অবস্থান করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছি। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সেটা অনায়াসেই বের করতে পেরেছে। অথচ প্রায় আট কিলোমিটার দূরের একটি দুর্ঘটনার উদ্ভট মামলায় আমাকে আসামি করে মাসের পর মাস মারাত্মকভাবে হয়রানি করা হয়েছে।

লালমনিরহাট শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের পৌর শহর পাটগ্রামের ঝালঙ্গী গ্রামে গতকাল সোমবার সকালে কালের কণ্ঠের সাংবাদিকরা সরেজমিনে পৌঁছালে নিহতের বাবা আব্দুর রহিম বলেন, আমার সন্তানকে কেউ মারেনি। সে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনায় সেদিন মারা গিয়েছিল। এতে আমাদের কোনো অভিযোগ বা ক্ষোভ নেই। সাংবাদিক তো দূরের কথা, আমি নিজে কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা করিনি। তখনকার ওসি মিজানুর রহমান আমাদের বাড়ি এসে এবং থানায় ডেকে দীর্ঘক্ষণ আটকে রেখে মামলা করার জন্য নানাভাবে চাপ দিয়েছিলেন; কিন্তু আমি মামলা করতে রাজি হইনি। পরে শুনি, হাতীবান্ধার মোশাররফ হোসেন নামের একজন বাদী হয়ে সাংবাদিকসহ অন্যদের নামে মামলা করেছে, যাকে আমরা চিনিও না। নিহতের মা রেজিয়া খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, কোনো নির্দোষ মানুষের ক্ষতি করে আমার হাফেজ বাবাকে কবরে কষ্ট দিতে চাই না।

না জানিয়ে কিংবা অনুমতি না নিয়ে এই মিথ্যা হত্যা মামলা দায়ের করায় আমরা বাদী মোশাররফ হোসেনের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। গত বছরের ৮ জুলাই পুলিশ মহাপরিদর্শক ও পুলিশ সুপারের কাছে পাঠানো এক আবেদনেও নিহতের বাবা আব্দুর রহিম এই মামলাটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, অসৎ উদ্দেশ্যে ও দুরভিসন্ধিমূলকভাবে দায়ের করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এবং নিরপরাধ আসামিদের মুক্তি দাবি করেন। মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পাটগ্রাম থানার এসআই আব্দুল জলিল জানান, ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে আজিজুলের লাশ উত্তোলনের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে। সহকারী পুলিশ順সুপার জয়ন্ত কুমার সেন জানান, এখন পর্যন্ত এই মামলায় ১৩ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আদালতের আদেশ সাপেক্ষেই পরবর্তী আইনানুগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর