কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
আড়াইশ বছরের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বহনকারী কিশোরগঞ্জের বিখ্যাত মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু যেন সম্পূর্ণ ক্ষতিকর রাসায়নিকমুক্ত ও নিরাপদ থাকে—এই প্রত্যয়ে সরাসরি বাগান পরিদর্শনে মাঠে নেমেছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) সোহানা নাসরিন। আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে তিনি মঙ্গলবাড়িয়ার বিখ্যাত লিচু বাগানগুলো সরজমিনে ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় লিচু চাষিদের সঙ্গে সার্বিক বিষয় নিয়ে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।
বাগান পরিদর্শন শেষে পাকুন্দিয়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, "মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর সুনাম দেশজুড়ে। ভোক্তারা যেন সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বিষমুক্ত লিচু পেতে পারেন, তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। এর বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়াও অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা দরকার। বাগানের লিচুতে কোনোভাবেই ক্ষতিকর রাসায়নিক বা হরমোন স্প্রে করা যাবে না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।"
ডিসি একই সঙ্গে লিচুর দাম যেন সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে না যায়, সেদিকেও চাষি ও ব্যবসায়ীদের সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাষিদের সব ধরনের আইনি ও টেকনিক্যাল সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি আরও বলেন, "আমি আজ সরাসরি এখানে এসে আপনাদের সঙ্গে কথা বলে মাঠপর্যায়ের সুযোগ-সুবিধা ও বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট সমস্যার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পেরেছি।"
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিফাত জাহান এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূরে-ই-আলম। এছাড়াও মঙ্গলবাড়িয়া এলাকার শতাধিক নিবন্ধিত লিচু চাষি, ফল ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার স্থানীয় মানুষ এই সভায় অংশ নেন।
উল্লেখ্য, কিশোরগঞ্জের মঙ্গলবাড়িয়ার সুস্বাদু লিচুর রয়েছে প্রায় আড়াইশ বছরের এক গৌরবময় ইতিহাস। অনন্য মিষ্টি স্বাদ, চমৎকার সৌরভ ও রসালো গুণের কারণে এই লিচু সারা দেশে যুগ যুগ ধরে বিশেষ কদর পেয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর চাহিদা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে, যা স্থানীয় চাষিদের জন্য এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।
পাকুন্দিয়া উপজেলার মঙ্গলবাড়িয়া, কুমারপুর, হোসেন্দী ও নারান্দী এলাকায় বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত প্রায় ১২ হাজার ফলন্ত লিচু গাছ রয়েছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বাম্পার মৌসুমে এসব এলাকা থেকে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে স্থানীয় সাধারণ লিচু চাষিরা অভিযোগ করেন, প্রতি বছর মৌসুমের শুরুতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা বেশি মুনাফার লোভে লিচু দ্রুত পাকানো ও চকচকে লাল রং আনতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার করেন। এতে লিচুর স্বাভাবিক গুণমান ও আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী সুনাম নষ্ট হয় এবং ভোক্তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। জেলা প্রশাসকের এই ঝটিকা সফর ও সুস্পষ্ট কড়া বার্তায় প্রকৃত চাষিরা এখন সুদিনের আশা দেখছেন।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে লিচু গাছ থেকে পাড়া এবং বাজারজাতকরণের শেষ সময় পর্যন্ত যেন কোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না হতে পারে, সেজন্য মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত কড়া তদারকি ও তদারকি টিম মাঠে থাকবে। পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে স্থানীয় পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
আকাশজমিন / আরআর