সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
সুন্দরবনের বনকর্মীদের গুলিতে জেলে আমিনুর রহমান গাজী নিহত হওয়ার ঘটনায় খুলনার কয়রা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা করা হযেছে । নিহতের ভাতিজা অলিউল্লাহ বাদী হয়ে বুধবার রাতে এ মামলা দায়ের করেন। দায়েরকৃত হত্যা মামলায় সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের নলিয়ান ফরেস্টের এসও মোবারক হোসেন ও সদর রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শামীম রেজা মিঠু। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো ৯/১০ জনকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় বিবরণে জানা যায়, বাদী অলিউল্যার চাচা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ৯নং সোরা গ্রামের মোকছেদ গাজীর ছেলে আমিনুর রহমান গাজী (৪৫) বনবিভাগের পারমিট নিয়ে সুন্দরবনের মধ্যে বিভিন্ন নদী খালে মাছ কাঁকড়া মেরে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বেশ কিছুদিন ধরে আমার চাচার কাছে আসামিরা চাঁদা দাবি করে আসছিল।
১৫ দিন আগে আমার উক্ত চাচা বৈধভাবে সুন্দরবনের পাশ নিয়ে বনের অভ্যন্তরে মাছ, কাঁকড়া ধরতে থাকলে ২নং আসামীসহ অজ্ঞাত নামা ৯/১০ জন তারা আমার চাচার কাছ থেকে জোর পূর্বক তাদের দাবীকৃত টাকা এ নিয়ে আমার চাচার সাথে তাদের বচসা হয়। ১ ও ২নং আসামী এসময় আমার চাচাকে বলে সুযোগ পেলে দেখে নেব।
এমতাবস্থায়, আমার উক্ত চাচা আমিনুর গাজী আমি ও আমাদের গ্রামের আব্দুল আলিম (২৫), -ফারুক গাজী ও একই গ্রামের কামরুল ইসলাম (৪০), বিএলসি পারমিট নং-৬০, নং-০০১১৯২ মূলে গত-১৩ মে তারিখে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে দুইটি ট্রলারযোগে পৌছে মাছ, কাঁকড়া ধরতে থাকে।
একপর্যায়ে আমি উক্ত চাচা আমিনুর গাজী ও আব্দুল আলিম খুলনা জেলার মধ্যে কয়রা থানা এলাকার পাতকোষ্টা বেশো খালে গত ১৮ মে সকাল ৭ টার দিকে নৌকায় অবস্থান পূর্বক মাছ, কাঁকড়া ধরতে থাকে। এসময় ১ ও ২নং আসামীর নেতৃত্বে অজ্ঞাতনামা ৯/১০ জন স্প্রিট বোর্ড ও ট্রলার যোগে সেখানে আসে। অতঃপর, আসামীরা স্প্রিট বোর্ড ও ট্রলার থেকে নেমে বেশো খালে ওঠে। ১নং আসামী আমার চাচা আমিনুর গাজীকে দেখতে পেয়ে তাকে টাকা নিয়ে তার কাছে আসতে বলে।
আমার উক্ত চাচা অনিহা প্রকাশ করলে ১ ও ২নং আসামী হুংকার দিয়ে চাচাকে অবান্তর ভাষায় গালমন্দ করে করতে থাকে এবং বলে যে, আজ তোর শেষ দিন। আমার চাচাসহ আমি ও আব্দুল আলিম আসামীদের কাছে থাকা অস্ত্রপাতি দেখে ভয়ে ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে পড়ি। এসময় ১ ও ২নং আসামীসহ অজ্ঞাতনামা ৯/১০ জন তাদের হাতে থাকা অস্ত্র উচিয়ে আমাদের দিকে তেড়ে আসতে থাকে।
আসামীরা পাশে এসে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক ১নং আসামীর হাতে থাকা রাইফেল দ্বারা আমার চাচা আমিনুর গাজীকে খুন করার উদ্দেশ্যে বুক লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে, ছোড়া গুলি আমার চাচার বুকে না লেগে বাম পার্শ্বের মাজা ও কিডনী বরাবর লেগে পুরুষাঙ্গ ভেদ করে ডান পার্শ্বের উরু দিয়ে বের হয়ে যায়। সাথে সাথে আমার চাচা আমিনুর গাজী নৌকার উপর রক্তাক্ত জখম অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে ছটপট করতে করতে মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকে।
তখন আসামীগণ আমাদের অন্য নৌকা জোর পূর্বক নিয়ে চলে যায়। আমার চাচার উক্ত স্থান দিয়ে অঝরে রক্ত ঝরতে থাকে। একপর্যায় অনুমান ২০ মিনিট পর সে মারা যায়। তখন আমি, আব্দুল আলিম ও পাশের নৌকায় থাকা আহম্মাদ আলী একত্রে মিলে নৌকা যোগে চাচার মৃতদেহ নিয়ে ওই দিন বিকেল ৫ টার দিকে নিয়ে বাড়িতে ফিরি।
খুলনার কয়রা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শাহ আলম মামলায় বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নিহতের ভাতিজার এজাহার পেয়ে ৩০২/৩৪ ধারায় তারা একটি মামলাটি গ্রহণ করেছেন। থানার সাব ইন্সপেক্টর সোহাইলকে মামলার তদন্তভারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি দায়িত্ব পেয়ে গভীরভাবে মামলাটি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছেন।
এ বিষয়ে বিভাগীয় বনসংরক্ষক এ জেড এম হাসানুর রহমান জানিয়েছেন, সামগ্রিক ঘটনায় বন সংরক্ষক খুলনা অঞ্চলের প্রধান ইমরান আহমেদ এর পক্ষ থেকে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটিতে বিভাগীয় বন সংরক্ষণ (পূর্ব) কে প্রধান কোস্টগার্ডের একজন প্রতিনিধি, খুলনা জেলা প্রশাসনের একজন প্রতিনিধি এবং একজন সহকারী বনসংরক্ষককে সদস্য সচিব করা হয়েছে।
উক্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ না করা পর্যন্ত তারা বিস্তারিত কোন কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি জানান, বন বিভাগের পক্ষ থেকেও কয়রা থানায় তিনজনের নাম উল্লেখপূর্বক তারাও একটি হত্যা প্রচেষ্টা মামলা দায়ের করেছেন । এ মামলায় বনবিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারিদের সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে।
এদিকে উপরোক্ত ঘটনার জের ধরে ১৮ মে বিকালে সাতক্ষীরা শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী বন বিভাগের অফিস ভাঙচুরের ঘটনায় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ছবি সংগ্রহ করে তাদের পরিচয় নিশ্চিত পূর্বক শ্যামনগর থানা আরেকটি মামলা দায়ের করা হবে বলে জানান তিনি। তবে রাতে শ্যামনগর থানার ওসি সেল ফোন জানান, বুড়িগােয়ালিনী ফরেষ্ট অফিস ভাংচুরের বিষয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বনবিভাগের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।