খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার দাকোপ উপজেলার খোনা এলাকায় একটি পৈতৃক ও বন্দোবস্তকৃত মাছের ঘেরের মালিকানা কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের বর্বরোচিত হামলায় ৫ জন গুরুতর আহত হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দুইজনকে আটক করে খুলনা র্যাব-৬ এর একটি চৌকস দল। তবে পরবর্তীতে উপজেলা সদর চালনায় এক নজিরবিহীন তাণ্ডব চালায় উত্তেজিত জনতা। তারা র্যাবের ওপর চড়াও হয়ে সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করে আটককৃত দুই আসামিকে প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর চালনা পৌর এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে পুরো এলাকায় চরম থমথমে ও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের খোনা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ওয়াপদা বেড়িবাঁধের বাইরে অবস্থিত প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে বেশ কয়েক বছর যাবৎ আব্দুল্লাহ ফকির, বাবলু সানা ও সাজ্জাদ হোসেন সরদার যৌথভাবে মাছ চাষ করে আসছেন। কিন্তু সম্প্রতি খোনা এলাকার মুকুন্দ মন্ডল, বাচ্চু ফকির ও রসুল গাজী গংদের সহিত উক্ত মাছের ঘেরের মালিকানা ও দখল নিয়ে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৬ মে সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে বাচ্চু ফকিরের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘেরটি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালায়। এ ঘটনায় বাচ্চু গংদের ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাকোপ থানায় আকরাম আলী ফকির বাদী হয়ে গত ২১ মে একটি মামলা (মামলা নং-৮) দায়ের করেন।
আকরাম আলী ফকিরের ছেলে আব্দুল্লাহ ফকির গংদের দাবি, তারা গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ঘেরে মাছ ধরার সময় উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও খোনা এলাকার প্রতিপক্ষ নেতা বাচ্চু ফকিরের নেতৃত্বে ২০/২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল উক্ত ঘেরে ফিল্মি স্টাইলে অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় আব্দুল্লাহ গংদের ৫ জন মারাত্মক জখম ও গুরুতর আহত হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। আহতরা হলেন পানখালী এলাকার জসিম মোল্যা (৩২), হাফিজুর মোল্যা (৪০), আবু মুসা শেখ (৩১), জাফর সরদার (৩১) ও সাজ্জাদ হোসেন সরদার (৫৪)।
পরবর্তীতে গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে বাচ্চু ফকিরের অনুসারী লোকজন এই ঘটনার প্রতিবাদে উপজেলা সদর চালনায় একটি বিক্ষোভ মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এসময়ে খুলনা র্যাব-৬ এর সদস্যরা ওই মামলার এজাহারভুক্ত দুই প্রধান আসামি মুকুন্দ মন্ডল ও রসুল গাজীকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করে। পরবর্তীতে র্যাব সদস্যরা তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় চালনা আচঁভুয়া বাজার এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় উত্তেজিত জনতা ও বিক্ষোভকারীরা র্যাবের গাড়ি অবরুদ্ধ করে চরম বিক্ষোভ করতে থাকে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে র্যাবের গাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়, জানালার কাচ ভাঙচুর করে এবং র্যাব সদস্যদের বাধা ঠেলে আটককৃত দুই আসামিকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়।
এই ঘটনার পর দুপুর ১২টার দিকে উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আব্দুল মান্নান খান, চালনা পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শেখ মোজাফফর হোসেন ও সদস্য সচিব আলামিন সানার নেতৃত্বে তাৎক্ষণিক এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ লিখিত বক্তব্যে বলেন, "সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ভূমিহীনদের বন্দোবস্তকৃত ও সরকারি ওই জমি জোর করে দখলে নিয়ে আব্দুল্লাহ ফকির ও রাশেদ কামালের সাথে স্থানীয় লোকজনের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। আমরা পরিস্থিতি শান্ত রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সব সময় সহযোগিতা করে আসছি। আমরা জানতে পারি আজ একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু খুলনা থেকে র্যাব এসে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই ওই মিছিল থেকে সাধারণ লোক তুলে নিয়ে যাচ্ছিল। পরবর্তীতে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করি।” তবে র্যাবের ওপর হামলা ও আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে তারা নিজেদের দায় অস্বীকার করে বলেন, “এ ব্যাপারে আমরা স্পষ্ট কিছু জানি না, কারা বা কোন উত্তেজিত জনতা এমনটা করেছে তা আমাদের জানা নেই।”
এ বিষয়ে দাকোপ থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খাইরুল বাসার বলেন, "সরকারি কাজে বাধা দান এবং র্যাবের ওপর হামলা ও আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। ছিনতাই হওয়া আসামিদের পুনরায় আটকের জন্য পুলিশের বিশেষ অভিযান চলছে। বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও শান্ত আছে।"
আকাশজমিন / আরআর