আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের মেগা ফাইনালে ইংলিশ জায়ান্ট আর্সেনালকে হারিয়ে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের বা পিএসজির (PSG) ঐতিহাসিক শিরোপা জয়ের পর পুরো ফ্রান্সজুড়ে সমর্থকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ট্রফি জয়ের আনন্দের রাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফুটবল ভক্তদের উগ্রতা ও ভাঙচুরের এ ঘটনায় দেশজুড়ে ৪ শতাধিক ব্যক্তিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে ফরাসি পুলিশ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসির (BBC) এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, শনিবার রাতের এই ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে রোববার ভোররাত পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ৪১৬ জন উগ্র সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন এলাকা থেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৮০ জন দাঙ্গাকারী।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ফাইনালে পিএসজির ঐতিহাসিক জয়ের পর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন সড়ক ও নামী চত্বরগুলোতে হাজার হাজার ফুটবল সমর্থক একযোগে রাস্তায় নেমে বিজয় উদ্যাপনে অংশ নেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং জননিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে আগে থেকেই বিপুলসংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে গভীর রাতে বিভিন্ন স্থানে একদল উগ্র পিএসজি সমর্থকের সঙ্গে কর্তব্যরত পুলিশের মুখোমুখি তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, উন্মত্ত সমর্থকরা শহরের বিভিন্ন প্রকাশ্য স্থানে অনবরত আতশবাজি ও ফ্লেয়ার ছুড়ছে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে যে, কোথাও কোথাও সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের মোটরসাইকেল ও বৈদ্যুতিক বাইকে সরাসরি আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া উন্মত্ত জনতার হামলায় কয়েকটি বড় বড় দোকানপাট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
প্যারিস পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, উগ্র সমর্থকদের সঙ্গে হওয়া এই সহিংস সংঘর্ষে অন্তত সাতজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং উগ্র জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের পক্ষ থেকে কয়েকটি স্পর্শকাতর এলাকায় কাঁদানে গ্যাস বা টিয়ার শেল ছুড়তে হয়েছে। এ ছাড়া ফুটবলারদের এই উন্মাদনামূলক সহিংসতার ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মোট ছয়টি সাধারণ যানবাহন, দুটি বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং একটি বাসস্টপ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সরকারি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ ফুটবল খেলার নামে উগ্র সমর্থকদের করা এসব সহিংস ও ধ্বংসাত্মক ঘটনাকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে তীব্র মন্তব্য করেছেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে গত ২০২৫ সালেও পিএসজির ইউরোপীয় শিরোপা জয় উদ্যাপন একইভাবে তীব্র সহিংসতায় রূপ নিয়েছিল। সে সময় সমর্থকদের মধ্যকার সেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দুজন সাধারণ মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে একজন ছিলেন মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক স্কুলপড়ুয়া কিশোর।
তবে রাতের এই নজিরবিহীন সহিংসতার আবহ ও থমথমে পরিস্থিতির মাঝেই আজ রোববার রাজধানী প্যারিসে পিএসজির চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি বিশাল ও বর্ণাঢ্য সরকারি বিজয় শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। এই রাজকীয় শোভাযাত্রার পাশাপাশি ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর ঐতিহাসিক বাসভবনে বিজয়ী ফুটবলারদের নিয়ে এক বিশেষ মধ্যাহ্নভোজ ও সাক্ষাতেরও কথা রয়েছে।