আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং রণক্ষেত্রের চেনা চেহারা এখন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বদলে যাচ্ছে। একসময় যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের সামনের সারিতে দুই দেশের হাজার হাজার পদাতিক সৈন্যদের মুখোমুখি রক্তক্ষয়ী ও সরাসরি সংঘর্ষ ছিল যুদ্ধের মূল দৃশ্যপট, এখন সেখানে ক্রমান্বয়ে জায়গা করে নিচ্ছে আধুনিক ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত রোবট এবং দূরনিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র। ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির (NDTV) এক বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে কোনো মানব সৈন্য সরাসরি বিপজ্জনক যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করা ছাড়াই ইউক্রেনের অনেক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। কিয়েভের বিস্ফোরক বহনকারী ছোট ছোট রোবটগুলো নিঃশব্দে রুশ অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর আকাশে থাকা শক্তিশালী নজরদারি ড্রোন পুরো পরিস্থিতির ওপর আকাশ থেকে কড়া নজর রাখছে। একই সঙ্গে রণক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে সম্পূর্ণ নিরাপদ নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসে অপারেটররা দূরনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করছেন পুরো সামরিক অভিযান।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সর্বাত্মক যুদ্ধ, দেশের অভ্যন্তরীণ তীব্র জনবল সংকট এবং পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর ভবিষ্যৎ সামরিক ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে নানা অনিশ্চয়তার কারণে ইউক্রেনীয় বাহিনী ক্রমশ অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়েছে। রণক্ষেত্রে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ড্রোন, রোবটিক স্থলযান এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রব্যবস্থার ব্যবহার বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে তারা। এই ধরনের আধুনিক চালকবিহীন অভিযানগুলো তুলনামূলকভাবে বিশাল ও জনবলে বলীয়ান রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা এনে দিচ্ছে। গত এপ্রিল মাসে ইউক্রেনের দূরদর্শী প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বিশ্ব দরবারে দাবি করেন যে, মানব ইতিহাসের সামরিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শুধু দূরনিয়ন্ত্রিত রোবট ও ড্রোন ব্যবহার করে একটি সুরক্ষিত রুশ সামরিক অবস্থান সম্পূর্ণ দখল করতে সক্ষম হয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। তিনি আরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে জানান যে, চলতি ২০২৬ সালের শুরু থেকে এই পর্যন্ত মানববিহীন ২২ হাজারেরও বেশি জটিল মিশন সফলভাবে পরিচালনা করেছে ইউক্রেনীয় সেনা কর্তৃপক্ষ।
রণক্ষেত্রের সম্মুখভাগে থাকা ইউক্রেনীয় সেনাদের নিজস্ব ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দি হওয়া অনেক রুশ সেনা এই বিস্ফোরকবাহী ছোট ছোট রোবটগুলোর ভয়াবহতা দেখে এগুলোর বিশেষ নাম দিয়েছে ‘সাইলেন্ট ডেথ’ বা ‘নীরব মৃত্যু’। এর মূল কারণ হলো, ইউক্রেনের তৈরি এই বিশেষ যুদ্ধযন্ত্রগুলো মাটির ওপর দিয়ে এতটাই নিঃশব্দে চলাচল করতে পারে যে, অনেক সময় মাত্র ১০ মিটার বা তার চেয়েও কম দূরত্বে এসে পৌঁছানোর পর রুশ সেনারা এগুলোর প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হন। কিন্তু ততক্ষণে এই মরণঘাতী রোবটগুলোর বিস্ফোরণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার আর কোনো উপায় বা কিছুই করার থাকে না রুশ বাহিনীর। পূর্ব ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী ও সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্র দনবাসে একসময় সরাসরি জীবন বাজি রেখে লড়াই করা ইউক্রেনীয় কমান্ডারদের কাছেও রণক্ষেত্রের এই আমূল পরিবর্তন আজ অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। দনবাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়া একজন অভিজ্ঞ ডেপুটি-কমান্ডার এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব নিয়ে নিজের বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘তখনকার দিনে আমি এমন কোনো রোবটিক প্রযুক্তির কথা কল্পনাও করতে পারিনি। যদি এই আধুনিক প্রযুক্তি তখন আমাদের হাতে থাকত, তাহলে হয়তো আমার অনেক বীর সহযোদ্ধা আজও আমাদের মাঝে বেঁচে থাকতেন।’ তিনি আরও আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘আগে যুদ্ধ ছিল মূলত মানুষের ব্যক্তিগত সামরিক দক্ষতা, শারীরিক শক্তি ও সাহসের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। কে কত ভালো প্রশিক্ষিত কিংবা কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ—এসব বিষয় ছিল জয়-পরাজয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন আধুনিক প্রযুক্তিই যুদ্ধের সব কিছু নির্ধারণ করে দিচ্ছে এবং এই মহাবিপ্লবী পরিবর্তন থেকে পেছনে ফিরে যাওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই।’
ইউক্রেনের এই নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক কৌশলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো রাশিয়ার ওপর এক ধরনের ধারাবাহিক ও মানসিক চাপ তৈরি করা। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে, তারা এই প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতি মাসে প্রায় ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হতাহত বা যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত করার একটি কঠোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন এবং চলতি বছরের শুরু থেকে সেই লক্ষ্য পূরণ করা নিখুঁতভাবে সম্ভব হয়েছে বলেও তারা দাবি করছেন। তাদের রণকৌশলগত বিশ্লেষণ মতে, এর ফলে রাশিয়াকে বাধ্য হয়ে তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকে আরও বেশি করে নতুন জনবল বা সেনা সংগ্রহ করতে হবে, যা রাশিয়ার শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপরও সরাসরি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে। এদিকে, যুক্তরাজ্যের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ (GCHQ)-এর সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার সামরিক মৃত্যুর মোট সংখ্যা প্রায় ৫ লাখে গিয়ে পৌঁছেছে।
যুদ্ধের একদম শুরুর দিকে ড্রোন ও রোবটিক প্রযুক্তির ব্যবহার যেখানে ছিল কেবলই একটি নতুনত্ব বা পরীক্ষামূলক বিষয়, কিন্তু চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই দীর্ঘ সংঘাতের বাস্তবতায় এগুলো এখন ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রাত্যহিক দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অত্যাধুনিক রোবট কেবল হামলাই চালাচ্ছে না, বরং যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদের স্ট্রেচারে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে, সামনের সারির অবরুদ্ধ বাঙ্কারে রসদ ও গোলাবারুদ পৌঁছে দিতে এবং সরাসরি মরণঘাতী হামলা চালাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ তাই আজ শুধু দুটি দেশের ভূখণ্ডের লড়াই নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে, তারও এক বাস্তব বৈশ্বিক পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে।