আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দীর্ঘদিনের সামরিক ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তির স্পষ্ট আভাস মিলতেই তেহরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা শেষ হওয়ার এক অভূতপূর্ব সম্ভাবনা তৈরি হলেও, খোদ ইরানের ভেতরেই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী এই শান্তিচুক্তি চিরতরে ভেস্তে দিতে বা ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের (The New York Times) এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমটির সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের জাতীয় সংসদ এবং দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের কিছু অত্যন্ত প্রভাবশালী ও রক্ষণশীল সদস্যকে নিয়ে এই কট্টরপন্থী রাজনৈতিক শিবিরটি গঠিত হয়েছে। তারা সংখ্যায় দেশটির সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও, নিজেদের নিয়োজিত বিভিন্ন জনসভা, শক্তিশালী মিডিয়া প্ল্যাটফরম এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো ধরনের আপস বা চুক্তির তীব্র ও প্রকাশ্য বিরোধিতা করে যাচ্ছেন। ফলে এই শান্তিচুক্তিটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এখনো চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। অপরদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই চুক্তি নিয়ে সাবধানী পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। গত শুক্রবার ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের (White House) সিচুয়েশনরুমে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে নিজের মন্ত্রিপরিষদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই বিষয়ে এক গোপন বৈঠক করলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন।
এদিকে, তেহরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরান কোনো অবস্থাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না এবং ‘শত্রুপক্ষ তথা ওয়াশিংটন আগে শর্ত মেনে পদক্ষেপ না নিলে’ ইরান নিজেদের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য কোনো অগ্রণী পদক্ষেপ নেবে না। তবে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনের ভেতরে এই তীব্র বিতর্ক এখন সম্পূর্ণ প্রকাশ্য রূপ ধারণ করেছে। কট্টরপন্থীদের দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ক্রমাগত এই শান্তি আলোচনার তীব্র সমালোচনা করছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনাটি ইতিমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে বলে দেশজুড়ে প্রচার করছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের এই নেতিবাচক কাভারেজের ঘটনায় চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানের দূরদর্শী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টিভির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরাসরি নিজের দপ্তরে তলব করেন এবং তাদের এই ধরনের একপেশে প্রচারণার মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক বিভেদ না বাড়াতে কড়া ভাষায় সতর্ক করেন। এ সময় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান কর্মকর্তাদের বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেন যে, যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত হওয়া ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিই স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার বিষয়ে পুরোপুরি সম্মত ছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘অথচ সাবেক নেতার সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এখন আমরা দেশজুড়ে কুৎসা প্রচার করছি যে আমাদের শত্রুর সঙ্গে কোনো আলোচনা করা উচিত নয়।’
গণমাধ্যমের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চুক্তিবিরোধী এই কট্টরপন্থী মনোভাবের সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত শুক্রবার তেহরানের প্রকাশ্য রাস্তায়। সেখানে হাজার হাজার কট্টরপন্থী সমর্থক ও ছাত্ররা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে জড়ো হন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বজায় রাখার পক্ষে স্লোগান দেন। কট্টরপন্থী রক্ষণশীল এমপি ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের খুব ভালো করে জানা উচিত যে ইরান এই যুদ্ধের একমাত্র বিজয়ী পক্ষ এবং ইরানই এই চুক্তির মূল শর্তগুলো নির্ধারণ করবে।’ নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কট্টরপন্থীদের এই আক্রমণ শুধু সরকারের আলোচনা দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনির দিকেও ধেয়ে গেছে। মোজতাবা খামেনি তার সদ্যঃপ্রয়াত বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকেই অভ্যন্তরীণ তীব্র রাজনৈতিক বিরোধের মুখে পড়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার রক্ষণশীল আইনপ্রণেতা হামিদ রাসায়ী হজরত নুহ (আ.)-এর অবাধ্য পুত্রের ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে সামাজিক মাধ্যমে একটি বিতর্কিত পোস্ট করেন, যেখানে তিনি পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত করেন যে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক কাউকে কোনো পদের জন্য ধার্মিক বা যোগ্য করে তোলে না। তেহরানের রাজনৈতিক মহল এটিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতার ওপর একটি সরাসরি পরোক্ষ আক্রমণ হিসেবেই দেখছে। যদিও তীব্র সমালোচনার মুখে রাসায়ী পরে দাবি করেন, তার এই মন্তব্যটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও জানা যায়, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের অন্যতম কট্টরপন্থী নেতা আলী বাঘেরি কানি বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার কাছে একটি অত্যন্ত গোপন চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেন যে, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে হওয়া দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধিদল অতিরিক্ত নরম ও আপসকারী মনোভাব দেখিয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমটি জানায়, মূলত প্রধান আলোচক গালিবাফ ও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে সর্বোচ্চ নেতার কাছে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করতেই বাঘেরি কানি এই চাল চালেন। কারণ এর আগে গত এপ্রিল মাসে গালিবাফ ও পেজেশকিয়ান খামেনির কাছে একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যেখানে স্পষ্ট সতর্ক করা হয়েছিল যে এই চুক্তি না হলে ইরান তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও গণ-অসন্তোষের মুখে পড়বে। বাঘেরি কানি সেই চিঠিতে নিজে স্বাক্ষর তো করেনইনি, উল্টো সেই চরম গোপন রাষ্ট্রীয় তথ্য কট্টরপন্থী সংসদ সদস্যদের কাছে ফাঁস করে দিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে রাজপথে নিয়ে আসেন।
যুদ্ধ শুরুর পর গত বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো ইরানের পার্লামেন্ট জরুরি অধিবেশনে বসে। সেখানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে একটি কড়া বার্তা পাঠান। তিনি কট্টরপন্থীদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অভ্যন্তরীণ এই অনর্থক রাজনৈতিক কামড়াকামড়ি ও সামাজিক বিভাজন শুধু আমাদের শত্রুপক্ষকেই সুবিধা দেবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তিনি সবাইকে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।