বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, বন্য প্রাণী ও জলজ প্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় ১ জুন থেকে টানা তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বন বিভাগ। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ৩১ আগস্ট পর্যন্ত জেলে, বাওয়াল, মৌয়াল, গোলপাতা সংগ্রহকারী ও পর্যটকরা সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না। ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর এই সময়ে সুন্দরবন রক্ষা ও প্রাণীদের প্রজনন নিশ্চিত করতে বন বিভাগ এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করে আসছে। এর ফলে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি আরও বেশি সজীবতা লাভ করে বলে দাবি বন বিভাগের। তবে এ বছর করমজলকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। যার ফলে এই নিষেধাজ্ঞার সময়ও সুন্দরবনের করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্র ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন দর্শনার্থীরা।
অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার ফলে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল বনজীবী ও জেলেরা বেকার হয়ে পড়বেন। অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করবেন তারা। সেই আশঙ্কায় জেলেদের রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার সময় কমানোর দাবি জানিয়েছেন জেলেরা। শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের বগী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশীদ বলেন, ‘সুন্দরবন আর আমাদের বাড়ির মাঝে শুধুমাত্র একটা নদী। ছোটবেলা থেকে এই সুন্দরবনের উপর জীবিকা নির্বাহ করে আমরা বেঁচে থাকি। কিন্তু এখন বারবার বন্ধ থাকে, আবার বছর যায় অভয়াশ্রম এলাকা বৃদ্ধি পায়, কীভাবে বাঁচব আমরা? আর এই সময় সরকার যে সহযোগিতা করে, তা আমাদের মতো জেলেদের কাছে পৌঁছায় না। এগুলো যায় বড় মিয়াদের ঘরে।’ জেলে মাসুম হাওলাদার বলেন, ‘এই সময়ে সরকার যে সহযোগিতা করে তা যদি আমরা সবাই পেতাম তাহলে আমাদের কষ্টটা কম হতো।’
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার (রয়েল বেঙ্গল টাইগার), মায়াবী হরিণ, বানর, কুমির, গুইসাপসহ ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ প্রাণী, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর এবং বিভিন্ন প্রকার মাছসহ ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণী, ২৯০ প্রজাতির পাখি ও ৩৪৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে দুই প্রজাতির উভচর, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৫ প্রজাতির পাখি এবং পাঁচ প্রজাতির স্তন্যপায়ী বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে দর্শনার্থীদের ভিড়, বনজীবীদের কর্মযজ্ঞ ও চোরাশিকারিদের দাপটে আরও বেশি সংকটে পড়ে এসব প্রাণ-প্রকৃতি। সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে ১৪টি পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে যেখানে প্রতিবছর কয়েক লক্ষ মানুষ ভ্রমণ করেন। এছাড়া বন বিভাগকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে বছরের বিভিন্ন সময় অর্ধলক্ষ বনজীবী মাছ, গোলপাতা ও মধু আহরণ করে থাকেন।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের বেশিরভাগ বন্য প্রাণী ও জলজ প্রাণীর প্রজনন মৌসুম। পাশাপাশি এই সময়ে বনে প্রচুর চারা গজায়। তাই এই তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে সুন্দরবনের সজীবতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। তবে এ বছর প্রথমবারের মতো শুধুমাত্র করমজল দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান বনের এই কর্মকর্তা। প্রতি বছরের মতো এবারও নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে পালন করতে বন বিভাগ তৎপর রয়েছে।