আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের উদ্যোগে দলীয় কাঠামো এবং নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলছে। দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারানোর পর দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করতে কাজ শুরু করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত শেখ রেহানার ঘনিষ্ঠ বলয়ের প্রভাব কমে আসছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সূত্রমতে, ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের ভেতরে ব্যাপক আত্মসমালোচনা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দলীয় পর্যায়ে সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা, জনগণের অসন্তোষ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা দলকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, শেখ রেহানার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত একটি বলয়কে এখন আর আগের মতো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের ভেতরে অনেকের মতে, দলের সংকট, বিতর্ক এবং জনঅসন্তোষের পেছনে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল। ফলে দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নতুন নেতৃত্ব ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সামনে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শেখ হাসিনা বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং দলের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছেন। একই সঙ্গে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও সরাসরি খোঁজখবর নিচ্ছেন।
দলীয় সূত্রগুলোর মতে, শেখ রেহানা এবং তার ঘনিষ্ঠদের ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয় গড়ে উঠেছিল। শেখ রেহানার দেবর ও শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিককে কেন্দ্র করেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ছিল। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসন, উপদেষ্টা নিয়োগ, সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এ বলয়ের প্রভাব ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
যদিও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে কখনো স্বীকার করেননি। তবে দলীয় অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও সমালোচনা ছিল বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, আওয়ামী লীগ এখন এমন নেতাদের সামনে আনতে চায়, যাদের জনগ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি এবং যারা বড় ধরনের বিতর্কের সঙ্গে জড়িত নন। শেখ হাসিনা দুর্নীতি, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং জনঅসন্তোষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে আগ্রহী বলেও সূত্রগুলোর বক্তব্য।
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাভিত্তিক আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও জবাবদিহি এবং অংশগ্রহণমূলক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
বর্তমানে দলীয় পুনর্গঠন কার্যক্রমে সক্রিয় কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত বর্তমানে সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, নানক, মায়া এবং শেখ সেলিম ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত কয়েকটি ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অনেকেই এটিকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাঠামোর সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
এদিকে দলীয়ভাবে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনে এসব মহানগর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
তবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দলীয় কিছু অভিযোগ ও গুঞ্জনকে পরিকল্পিত অপপ্রচার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, শেখ হাসিনা সরাসরি সাংগঠনিক কার্যক্রম তদারকি করছেন এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সচল রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দলীয় সূত্রগুলোর মতে, আওয়ামী লীগের চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আগামী দিনের নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে দলটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।