তীব্র অর্থসংকটে পড়ে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সামগ্রিক কার্যক্রম। দীর্ঘ দুই মাস ধরে কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ৩৮ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী। ফলে উৎসবের মুখে এসে তাদের মধ্যে তীব্র আর্থিক অনটন ও চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এশিয়া পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য উঠে এসেছে।
জানা গেছে, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতি মাসে নিয়মিত অফিস পরিচালনা খরচ প্রায় ১৬ লাখ টাকা, যার মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদই প্রয়োজন হয় ১২ লাখ টাকা। সরকারি তহবিল থেকে সর্বশেষ গত মার্চ মাসে কর্মীরা তাঁদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পেয়েছিলেন। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে কর্মীদের চরম মানবিক সংকটের কথা বিবেচনা করে এপ্রিল মাসের বেতন বাবদ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কামাল আকবর তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিনা সুদে এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ধার হিসেবে দিয়েছেন। তবে মার্চ ও মে মাসের বেতন এখনো বকেয়া রয়ে গেছে, যা পাননি ফাউন্ডেশনের কর্মীরা।
গণমাধ্যমের তথ্য মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং আহত ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০২৪ সালে এই ফাউন্ডেশন গঠন করে সরকার। ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ফাউন্ডেশনকে ১০০ কোটি টাকার প্রাথমিক অনুদান দেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ কোটি এবং সাধারণ মানুষের অনুদানসহ মোট ১১৯ কোটি টাকার একটি বড় তহবিল গঠিত হয়। প্রথম দফায় এক হাজারের বেশি আহত ও শহীদ পরিবারকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। বিশেষ করে গুরুতর আহতদের চোখ, হাত-পা ও স্নায়ুর জটিল অস্ত্রোপচার এবং থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসার পেছনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। পরবর্তী সময়ে বড় কোনো নতুন সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান না আসায় চলতি বছরের গোড়ার দিক থেকে তহবিলে টান পড়ে এবং বর্তমানে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সামসি আরা জামান এই সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, “ফাউন্ডেশন বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের যারা কর্মচারী আছে, তাদের বেতন দিতে পারছি না।” অন্যদিকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল আকবর বলেন, “এখানে যারা কাজ করছেন তাদেরও পরিবার আছে। তারা ঈদে বাড়ি যাবে; কিন্তু বেতন পায়নি। মানবিক দিক বিবেচনায় আমার পেনশন (সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পাওয়া) থেকে এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ টাকা ধার হিসেবে দিয়েছি। তার পরও তাদের ঈদের বোনাস দিতে পারিনি।”
ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের সরাসরি অভিযোগ, বারবার সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করা সত্ত্বেও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। সামসি আরা জামান অভিযোগ করে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এমন কেউ বসে আছেন, যিনি ফাউন্ডেশনকে ভাঙতে চান। আমরা টাকার জন্য সব জায়গায় গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছি। সরকারের কোনো আন্তরিকতা দেখতে পাইনি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর কাছে গিয়েছি; কিন্তু তার আন্তরিকতা দেখিনি। ১৮ মে আমাদের সময় দিয়েও দেখা করেননি। ১৯ তারিখে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম। আমি একজন শহীদ-মাতা হিসেবে ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, অথচ তার দলীয় লোকজন ঢুকছিল কিন্তু আমাদের সুযোগ দেওয়া হয়নি।”
পরবর্তীতে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের শরণাপন্ন হলে তিনি সময় দিলেও জানান যে তহবিলের বিষয়টি তাঁর হাতে নেই। স্পিকারের কাছে সংসদে বরাদ্দের বিষয়টি উত্থাপনের আহ্বান জানালেও তা করা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল আকবর গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন এবং সেখান থেকে ইতিবাচক জবাবের অপেক্ষায় আছেন। সাধারণ সম্পাদক সামসি আরা জামান মনে করেন, এই ফাউন্ডেশন ভেঙে দেওয়া মানে জুলাই বিপ্লবকেই ভেঙে দেওয়া, কারণ তাঁরা যে সেবা দিচ্ছেন তা সরকারের অন্য কোনো জায়গা থেকে দেওয়া সম্ভব নয়।