ইউরোপের উন্নত দেশ পর্তুগালে সরকারের প্রস্তাবিত নতুন শ্রম আইনের বিরুদ্ধে ডাকা এক ঐতিহাসিক ও সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘটে পুরো দেশ অচল হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করবে এমন গুরুতর অভিযোগে পর্তুগাল সরকারের প্রস্তাবিত এই বিতর্কিত শ্রম আইন সম্পূর্ণ বাতিলের দাবিতে দেশটির অন্যতম প্রধান ও বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠন সিজিটিপি এই সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার ভোর থেকেই পুরো পর্তুগাল জুড়ে এই ধর্মঘট শুরু হয়, যার ফলে দেশটির সাধারণ জনজীবন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার পর্তুগালের হাসপাতাল ও ফায়ার সার্ভিসের মতো অতি জরুরি এবং আপৎকালীন পরিষেবাগুলো সীমিত পরিসরে চালু রাখা সম্ভব হলেও, মেট্রোরেলসহ সরকারের প্রায় সব ধরনের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ধর্মঘটের সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে দেশটির রাজধানী লিসবনের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর। বুধবার লিসবনের প্রধান স্টেশনগুলো থেকে কোনো দূরপাল্লার ট্রেন ছেড়ে যায়নি, আবার বাইরে থেকে কোনো ট্রেন শহরের ভেতরে প্রবেশও করতে পারেনি। দূর-দূরান্ত থেকে স্টেশনে এসে অনেক যাত্রী ট্রেন বাতিলের খবর জানতে পেরে চরম হতাশা নিয়ে ফিরে যান। ধর্মঘট সফল করতে স্টেশনগুলোতে ভোর থেকেই অত্যন্ত সক্রিয় ও তৎপর ছিলেন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সদস্যরা।
ধর্মঘটের কারণে বুধবার মধ্যরাত থেকেই লিসবনের সমস্ত মেট্রোরেল স্টেশনের প্রধান প্রবেশপথগুলো লোহার ফটক দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়। সড়কগুলোতে অত্যন্ত সীমিত আকারে দু-একটি বাস চলাচল করলেও সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র রোদের মধ্যে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেক পর্তুগিজ নাগরিক ও স্থানীয় কর্মীরা নিজ উদ্যোগে কাজে না গিয়ে ধর্মঘটের প্রতি সংহতি প্রকাশ করলেও, তীব্র গণপরিবহন সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি চরম ভোগান্তি ও বিপাকে পড়েছেন দেশটিতে বসবাসরত হাজার হাজার অভিবাসী এবং দৈনিক মজুরিভিত্তিক সাধারণ কর্মীরা, যারা জীবিকার তাগিদে কাজে বের হতে বাধ্য হয়েছিলেন।
শুধু রাজধানী লিসবনই নয়, পর্তুগালের বিভিন্ন ছোট-বড় শহরে এই ধর্মঘটের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানিয়ে পূর্ণ কর্মবিরতি পালন করেছেন দেশটির নার্স, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন জরুরি পেশার হাজার হাজার মানুষ। শুধু তাই নয়, শিক্ষক ও শিক্ষা খাতের সর্বস্তরের কর্মীরাও এই ধর্মঘটে সরাসরি অংশ নেওয়ায় দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের পাঠদান ও পরীক্ষা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। শ্রমিক সংগঠন সিজিটিপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, এই আন্দোলনে সাধারণ শ্রমিকদের এমন ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই প্রমাণ করে যে, সরকারের এই অন্যায্য নতুন শ্রম আইন দেশের সাধারণ জনগণ কোনোভাবেই মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
সংগঠনটির জেনারেল সেক্রেটারি তিয়াগো অলিভেইরা এই বিষয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “সিজিটিপি দেশের সমস্ত শ্রমজীবী মানুষকে তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছে। এই সম্মিলিত ও ঐতিহাসিক আন্দোলনের মাধ্যমেই এই অন্যায্য আইন বাতিল করতে আমরা পর্তুগাল সরকারকে বাধ্য করব। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের যৌক্তিক দাবি সরকার কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারবে না।” অন্যদিকে, এই ধর্মঘটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে লিসবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, যেখানে একদিনেই পাঁচ শতাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত দিনে নিজ গন্তব্যে ভ্রমণ করতে না পেরে চরম বৈশ্বিক দুর্ভোগ ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি বিমান যাত্রী।