মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বর্তমান ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ দিকে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওএইসিডি) তাদের সর্বশেষ গ্লোবাল অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে এই আশঙ্কাজনক তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, প্রথম পথটি হলো চলমান এই তীব্র সামরিক সংঘাত যদি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক উপায়ে শেষ হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি মাঝারি ধরনের মন্দাভাব দেখা দেবে। আর দ্বিতীয় কঠিন পথটি হলো, যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয় এবং এর নেতিবাচক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব যদি বিশ্ববাজারে আরও গভীর হয়, তবে বিশ্বের অনেক ক্ষমতাধর ও অনুন্নত দেশই তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়বে। আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি স্পষ্ট করে বলছে, বিশ্ব অর্থনীতি আগামী দিনে যে পথেই এগোবে না কেন, এই যুদ্ধের কারণে আগের তুলনায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চরমভাবে ধীর হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের একটি মাত্র গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ বা বাণিজ্যিক রুট অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে কীভাবে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খল ওলটপালট হয়ে যেতে পারে, এই ইরান সংকট তারই সর্বশেষ বড় অনুস্মারক।
প্যারিসভিত্তিক এই সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ স্টেফানো স্কারপেত্তা ওএইসিডির সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে লিখেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও গতিপথ নির্ধারণের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন যে, একটি মাত্র চোকপয়েন্ট বা সংকীর্ণ নৌ-পথের কাছে আমাদের আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির এই চরম দুর্বলতা প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করার জন্য আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। ওএইসিডির পরিসংখ্যানগত হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে চলতি বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হবে ২.৮ শতাংশ, যা গত মার্চ মাসের পূর্বাভাসের চেয়ে সামান্য কম। এই ধারায় জি২০ ভুক্ত দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি চলতি বছর ৪ শতাংশ থাকবে এবং ২০২৭ সালে তা কমে ৩.১ শতাংশে নামবে। কিন্তু সংঘাত যদি কোনো কারণে দীর্ঘায়িত হয়, তবে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ২.১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে তা ১.৮ শতাংশে নেমে আসবে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল চীনের বাইরের এশিয়ার বড় অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদন সরাসরি হ্রাস পাবে। এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কারণে জি২০ দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি চলতি বছর আরও ০.৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে আরও ১.৩ শতাংশ বেড়ে যাবে।
তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের যে বিশাল বিনিয়োগের জোয়ার চলছে, তা যুদ্ধের এই বড় ধাক্কা সামলাতে কিছুটা সাহায্য করছে। বিশেষ করে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এই জ্বালানি সংকট থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকায় এর প্রধান সুবিধাভোগী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এআই খাতে বিশাল কর্পোরেট বিনিয়োগ এবং উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোর ব্যয়ের কারণে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ থাকবে, যা জি৭ দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে ওএইসিডি সতর্ক করেছে যে, এআই প্রযুক্তি বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও বেশি করে জ্বালানি বাজার, সেমিকন্ডাক্টর সাপ্লাই চেইন এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপকরণের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে, যা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে। ওএইসিডির মতে, এআই বিনিয়োগ প্রধানত তিনটি ফ্রন্টে বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছে; ডেটা সেন্টার চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা চিপ তৈরির উপাদান এবং হার্ডওয়্যার পরিবহনের বাণিজ্যিক রুট। স্টেফানো স্কারপেত্তা লিখেছেন, এই ব্যাঘাত ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হলে সামগ্রিক বিনিয়োগ দুর্বল হবে এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বাড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভসহ বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ‘ওয়েট অ্যান্ড সী’ বা ‘দেখো এবং অপেক্ষা করো’ নীতি গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর সূত্র অনুযায়ী, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সুদের হার প্রায় ০.৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে, যা আকাশচুম্বী প্রতিরক্ষা খরচ ও ক্রমবর্ধমান ঋণে জর্জরিত বিশ্ব সরকারগুলোর জন্য নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগকে সীমিত করে দেবে।