কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে সুদূর মিসর থেকে বাংলাদেশে এসে নতুন জীবনের সূচনা করেছেন ফাতমা আহম্মেদ শওকত মাহমুদ আলী (হাবিবা)। ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার দেশ হলেও কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের আন্তরিকতা, স্নেহ ও ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়েছেন এই মিসরীয় তরুণী।
জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌরসভার কামারকোনা মহল্লার বাসিন্দা আব্দুল জব্বারের ছেলে মো. জাহের (জহির) ২০১০ সালে পর্যটক ভিসায় মিসরে যান। পরে সেখানে কর্মজীবন শুরু করেন এবং বর্তমানে মিসরের আশরামাদান শহরে বসবাস করছেন। সেখানে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় শ্রমিক সরবরাহের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি।
২০২৩ সালের শুরুতে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে জাহেরের সঙ্গে পরিচয় হয় ফাতমা আহম্মেদ শওকত মাহমুদ আলীর। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, এরপর দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। দাম্পত্য জীবনে ২০২৪ সালের মে মাসে তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। তার নাম রাখা হয় ইয়াসিন জাহের আব্দুল জব্বার।
সম্প্রতি গত ৩০ মে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে নিজ গ্রামের বাড়ি কটিয়াদীতে আসেন জাহের। বিদেশি পুত্রবধূকে এক নজর দেখতে প্রতিদিনই স্থানীয় উৎসুক মানুষজন তাদের বাড়িতে ভিড় করছেন। এলাকার মানুষের কাছে বিষয়টি বেশ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশে এসে হাবিবা নতুন পরিবার ও নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে আসার আগে তার মধ্যে কিছুটা শঙ্কা কাজ করছিল। তবে এখানে এসে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।
হাবিবা বলেন, “আমি ভেবেছিলাম নতুন দেশ ও নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে কষ্ট হবে। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম সবাই আমাকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো গ্রহণ করেছেন। শ্বশুর-শাশুড়ি আমাকে মেয়ের মতো স্নেহ করেন। আমি এখানে শুধু একজন স্বামীই পাইনি, পেয়েছি একটি ভালোবাসার পরিবার।”
জাহেরের মা হেলেনা আক্তার বলেন, “আমাদের কাছে দেশের বা বিদেশের কোনো ভেদাভেদ নেই। ছেলের বউকে আমরা পরিবারের সদস্য হিসেবেই গ্রহণ করেছি। ভাষাগত কিছু সমস্যা থাকলেও ভালোবাসা ও আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই।”
জাহেরের বাবা আব্দুল জব্বার বলেন, “পুত্রবধূ খুবই ভদ্র ও মিশুক। সে আমাদের সম্মান করে এবং পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাকে নিয়ে আমরা গর্বিত।”
স্থানীয়দের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। অনেকেই এই দম্পতির সম্পর্ককে আন্তঃসাংস্কৃতিক সৌহার্দ্য, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিদেশি পুত্রবধূকে ঘিরে এলাকায় এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ তাকে দেখতে ও শুভেচ্ছা জানাতে বাড়িতে আসছেন। হাবিবার আন্তরিক আচরণ, বিনয়ী স্বভাব এবং হাসিমুখে সবার সঙ্গে মিশে যাওয়ার মানসিকতা স্থানীয়দেরও মুগ্ধ করেছে।
স্থানীয়দের মতে, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনের মাধ্যমে যে একটি সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব, হাবিবা ও জাহেরের সংসার তারই বাস্তব উদাহরণ। ভিন্ন দুই দেশের দুই মানুষের এই মিলন কেবল একটি পারিবারিক সম্পর্ক নয়, বরং দুই সংস্কৃতির মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিরও প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে তাদের সুখী দাম্পত্য জীবন এবং পারিবারিক সম্প্রীতির গল্প স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে যে ভৌগোলিক দূরত্ব ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যও জয় করা সম্ভব, মিসরীয় তরুণী হাবিবা ও কটিয়াদীর যুবক জাহেরের জীবনগল্প সেই বার্তাই নতুন করে তুলে ধরছে।