নব্বইয়ের দশক বা তার আগে যাদের জন্ম, আন্তর্জাতিক ফুটবলে ‘ব্রাজিলের নাম্বার নাইন’ বা ৯ নম্বর জার্সি বললেই তাদের চোখের সামনে একটি খুব চেনা ও চিরপরিচিত ছবি ভেসে ওঠে। এক টাক মাথার ফুটবল জাদুকর, যিনি চওড়া করে একটু হাসি দিলে সামনের দুটো দাঁতের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটা স্পষ্ট হয়ে উঠত। অথচ মাঠের সবুজ ঘাসে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের মনে প্রতিনিয়ত কাঁপন ধরিয়ে সেই লোকটাই এর চেয়েও কম ফাঁকা জায়গা পেলে অনায়াসে ঢুকে যেতেন প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে। তারপর চোখের পলকে বল পাঠিয়ে দিতেন প্রতিপক্ষের জালের গভীরে। তিনি আর কেউ নন, রোনালদো নাজারিও—ফুটবল ইতিহাসে যিনি বিশ্বজুড়ে ‘আর নাইন’ হিসেবে পরম খ্যাত ও সমাদৃত। রোনালদোর বিদায়ের পর বিশ্ব ফুটবলে কতজন স্ট্রাইকার এলেন আর গেলেন, কিন্তু ওই চেনা ঘরানার জাত ‘নম্বর নয়’ আর ফিরে আসেনি সেলেসাওদের বিখ্যাত জার্সিতে। দুয়ারে কড়া নাড়ছে বহু প্রতীক্ষিত ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীদের মনে তাই অবধারিত প্রশ্ন—এবার ব্রাজিলের বিখ্যাত ৯ নম্বর জার্সির গুরুভার যাঁর কাঁধে উঠেছে, সেই ম্যাথেউস কুনিয়া কি পারবেন কোটি ভক্তের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ মেটাতে? নাকি তিনিও পূর্বসূরিদের মতো ব্যর্থতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাবেন? বিশেষ ক্রীড়া বিশ্লেষণে এই বিষয়টি উঠে এসেছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০২ সালে রোনালদোর জাদুকরি বিদায়ের পর ব্রাজিলের বহুল কাঙ্ক্ষিত হেক্সা বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের মিশন যেমন কেবলই এক অধরা স্বপ্ন হয়ে থেকে গেছে, তেমনি পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের যুগের পর যুগ ধরে হাপিত্যেশ করতে হয়েছে একজন জাত সেন্ট্রাল স্ট্রাইকারের জন্য। ২০০৬ বিশ্বকাপে নিজের চেনা ছন্দের ছায়া হয়ে থাকার পরও ইনজুরি জর্জরিত রোনালদো করেছিলেন ৩টি গোল। তবে সেবার কোয়ার্টার ফাইনালের গেরো ছোটেনি ব্রাজিলের। চার বছর পর ২০১০ বিশ্বকাপে লুইস ফ্যাবিয়ানো চেষ্টা করেছিলেন বটে। গ্রুপ পর্বে জোড়া গোল আর শেষ ১৬-তে আরও এক গোল করেও দলকে পার করতে পারেননি সেই শেষ আটের কঠিন দেয়াল। বিশ্বকাপের আগের দীর্ঘ ৯ মাস দেশের জার্সিতে সম্পূর্ণ গোলহীন থাকায় ফ্যাবিয়ানোকে নিয়ে প্রশ্নের অন্ত ছিল না। মাঠের পারফরম্যান্সে তিনি কিছু উত্তর দিলেও তা দলের শিরোপা–খরা কাটানোর জন্য মোটেও যথেষ্ট ছিল না। ব্রাজিলের ফুটবলের সোনালি ইতিহাসে ফ্যাবিয়ানো তাই আজ এক বিস্মৃত অধ্যায়।
তবু লুইস ফ্যাবিয়ানোকে সান্ত্বনা পুরস্কার দেওয়া যায়, কিন্তু ২০১৪ সালে নিজেদের ঘরের মাঠে হওয়া বিশ্বকাপের ‘নাম্বার নাইন’কে তো ব্রাজিল সমর্থকেরা মন থেকেই চিরতরে মুছে ফেলতে চান! ফ্রেডের গায়ে কেন সেবার ব্রাজিলের বিখ্যাত নয় নম্বর জার্সি উঠেছিল, তা ফুটবল বোদ্ধাদের কাছে আজও এক বড় গোলকধাঁধা। পুরো টুর্নামেন্টে তাঁর পা থেকে এসেছিল মোটে ১টি গোল। মিনেইরোর সেই অভিশপ্ত সেমিফাইনালে শক্তিশালী জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার রাতে জার্সিতে মুখ ঢাকা ফ্রেডের সেই অসহায় ছবিটাই যেন হয়ে আছে ব্রাজিলের সেবারের ফুটবল ট্র্যাজেডির একমাত্র বিজ্ঞাপন। পরবর্তীতে ২০১৮ বিশ্বকাপে তৎকালীন কোচ তিতের অধীনে ব্রাজিলের স্ট্রাইকার পজিশনে এক সম্পূর্ণ নতুন আধুনিক ঘরানার জন্ম হয়। রোনালদো বা ফ্যাবিয়ানোদের যুগে ‘ট্যাকব্যাক’ কিংবা ‘হাই প্রেসিং’ শব্দগুলোর সঙ্গে প্রথাগত স্ট্রাইকারদের খুব একটা চেনা-পরিচয় ছিল না। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের হাওয়ায় বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। গ্যাব্রিয়েল জেসুস স্ট্রাইকার হয়েও নিচে নেমে রক্ষণে সাহায্য করতেন, মাঝমাঠের সঙ্গে বলের সংযোগ ঘটাতেন। কিন্তু বিধাতা যাকে গোল করার তুলি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তিনি যদি রংতুলি ফেলে ঘর গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তবে ক্যানভাস ফুটবে কী করে? আসল কাজটাই করতে পারলেন না জেসুস। ৫ ম্যাচে কোনো গোল না করেই রাশিয়া বিশ্বকাপ শেষ করলেন তিনি। ব্রাজিলও যথারীতি বিদায় নিল ইউরোপীয় শক্তির কাছে হেরে।
চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে ব্রাজিলের নয় নম্বর জার্সি গায়ে জড়ালেন রিচার্লিসন। ক্যারিয়ারের শুরুতে উইঙ্গার হিসেবে খেললেও পরে থিতু হন সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ডে। দোহার মরুভূমিতে রিচার্লিসনের শুরুটা অবশ্য রূপকথার মতোই ছিল। সার্বিয়ার বিপক্ষে তাঁর সেই চোখধাঁধানো বাইসাইকেল কিকটি কাতার বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা দৃশ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সার্বিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল আর দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে আরেকটি গোলের পর তাঁকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ চড়েছিল আকাশে। কিন্তু বিধি বাম! কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ঠিক আগে হ্যামস্ট্রিংয়ের মারাত্মক চোটে পড়েন তিনি। ব্রাজিলের কান্নার রাতে রিচার্লিসনকেও মাঠ ছাড়তে হয়েছিল কোনো গোল না করেই, বদলি খেলোয়াড় হিসেবে।
এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলের নয় নম্বর জার্সিটা যিনি পাচ্ছেন, এক অদ্ভুত রসিকতা হলো—তিনি আদতে কোনো প্রথাগত স্ট্রাইকারই নন! ম্যাথেউস কুনিয়ার কাতারে যাওয়ার সুযোগ হতে পারত, কিন্তু ভাগ্য সেবার সহায় ছিল না। স্পেন ও জার্মানি ঘুরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব উলভসে আসার পরেই মূলত পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন তিনি। দুর্দান্ত ড্রিবলিং স্কিল আর নজরকাড়া সব গোলের সৌজন্যে দ্রুতই নজরে পড়েন বিখ্যাত ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের। প্রিমিয়ার লিগের শুরুতে কিছুটা খাবি খেলেও মৌসুমের দ্বিতীয়ার্ধে নিজের জাত চেনাতে শুরু করেন কুনিয়া। তবে ইউনাইটেডেও তিনি ‘আউট অ্যান্ড আউট’ বা প্রথাগত স্ট্রাইকার নন, খেলেছেন মূলত বাঁ প্রান্ত ধরে। নিজেকে তিনি পরিচয় দিতে ভালোবাসেন ‘নাইন পয়েন্ট হাফ’ হিসেবে—যা মূলত নাম্বার নাইন এবং নাম্বার টেনের এক চমৎকার ডিজিটাল মিশেল।
ক্লাব ফুটবলে আলো ছড়ালেও ব্রাজিলের জার্সিতে কুনিয়ার পারফরম্যান্সকে দশে কত দেওয়া যাবে, তা নিয়ে বড় বিতর্ক হতেই পারে। দেশের হয়ে দীর্ঘ ২৩ ম্যাচে আন্তর্জাতিক গোল করেছেন মাত্র ১টি! তারপরও ক্লাব ফর্মের ওপর ভরসা রেখে সেলেসাওদের শুরুর একাদশে হয়তো এই মুহূর্তে তাঁর ওপরই চূড়ান্ত আস্থা রাখতে যাচ্ছেন কোচ। যদিও বর্তমান স্কোয়াডে সত্যিকারের প্রথাগত নাম্বার নাইন বলতে আছেন ব্রেন্টফোর্ডের স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগো। তবে প্রথম একাদশে কুনিয়াকে টপকে থিয়াগোর জায়গা পাওয়া নিয়ে এখনো বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন রয়েই গেছে। ইতিহাস বলে ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন হতে হলে নাম্বার নাইনকে জাদুকরি ভূমিকা রাখতেই হবে। ২০০২ বিশ্বকাপে সেটা করে দেখিয়েছেন রোনালদো, আবার ৯ নম্বর জার্সি না পরেও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে সেই অবিশ্বাস্য রূপকথা লিখেছিলেন কিংবদন্তি রোমারিও। এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হলো—ম্যাথেউস কুনিয়া কি পারবেন রোনালদো বা রোমারিওদের সেই সোনালি ও গৌরবময় উত্তরাধিকার মাঠে ফিরিয়ে আনতে? নাকি কেবলই এক ‘নাইন পয়েন্ট হাফ’ হয়েই থেকে যাবেন সেলেসাওদের জার্সিতে!