দীর্ঘদিন ধরে চলমান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ যেন এক নতুন মাত্রায় রূপ নিয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারির একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর, তার তীব্র ও ঝাঁজালো প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত ও প্রভাবশালী মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পত্তি অন্যায়ভাবে চুরি ও বাজেয়াপ্ত করে তা নিয়ে প্রকাশ্যে গর্ব করা অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং এটি চরম কূটনৈতিক দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পার্সটুডের এক বিশেষ প্রতিবেদনে ইরানিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনকে উদ্ধৃত করে এই চাঞ্চল্যকর ও বৈশ্বিক গুরুত্বসম্পন্ন তথ্যটি নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা তথা ট্রেজারি সেক্রেটারি বিশ্বমঞ্চে অত্যন্ত দম্ভ ও গর্বের সাথে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সম্পত্তি আটকে রাখা বা চুরির কথা স্বীকার করার পর তেহরান এই কঠোর জবাব দেয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি মার্কিন এই সাম্রাজ্যবাদী দম্ভের জবাব দিতে গিয়ে বিশ্ব সাহিত্যের এক অনন্য আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বিখ্যাত ব্রিটিশ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের কালজয়ী ও অমর রাজনৈতিক বিয়োগান্তক নাটক "ম্যাকবেথ" থেকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অংশ সরাসরি উদ্ধৃত করে আমেরিকার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থাকে কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখন সে বা তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে যে, তাদের বর্তমান বৈশ্বিক পদ ও আন্তর্জাতিক পদমর্যাদা তাদেরকে এমন এক বিপজ্জনক ফাঁদে জড়িয়ে ফেলেছে, যেন একটি অত্যন্ত নীচ, কুৎসিত ও বামনাকৃতির চোরের শরীরে জোর করে কোনো এক বিশাল ও লম্বা দৈত্যের রাজকীয় পোশাক পরিয়ে দেওয়া হয়েছে’। বাকায়ির এই সাহিত্যিক উপমার মাধ্যমে মূলত বোঝানো হয়েছে যে, আমেরিকার মতো পরাশক্তি বিশ্বমোড়লের ভূমিকায় থাকলেও তাদের কর্মকাণ্ড চোরের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
প্রসংগত উল্লেখ্য, ‘ম্যাকবেথ’ হলো মহাকবি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং বিশ্ববিশ্রুত একটি মনস্তাত্ত্বিক বিয়োগান্তক নাটক। এই ম্যাকবেথ নাটকের মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছিল স্কটল্যান্ডের এক সত্য ও ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তবে শেক্সপিয়ার তাঁর অনন্য শৈল্পিক সুষমা, গভীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং অসাধারণ সাহিত্যিক রুচি ও মেধার ওপর ভর করে এর নাট্যরূপে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন এবং এর সাথে মধ্যযুগীয় যুদ্ধের বিভিন্ন রোমহর্ষক ঘটনা অত্যন্ত নিপুণভাবে মিশ্রিত করেছিলেন। এই অমর ও কালজয়ী নাটকটি মূলত মানুষের অন্ধ রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যায় উপায়ে ক্ষমতা দখলের তীব্র লালসা এবং ক্ষমতার লোভীদের চরম শারীরিক ক্ষতি ও তাদের নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক ধ্বংসের গল্পকে নাটকের ইতিহাসে সবচেয়ে সেরা ও নিখুঁত উপায়ে ফুটিয়ে তুলেছে। ইরানের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি আমেরিকার এই অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ চুরির নীতিকে ম্যাকবেথের সেই পতনোন্মুখ ও লোভী চরিত্রের সাথে তুলনা করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ওয়াশিংটনকে বেশ বড় ধরনের কূটনৈতিক ও নৈতিক লজ্জার মুখে ফেলেছেন বলে মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকেরা।