পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা হারানোর এক মাস পার হতে না হতেই ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দলের সিংহভাগ আইনপ্রণেতাদের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহের মুখে দলটির সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বড় ধরনের বিপাকে পড়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত নির্বাচনী পরাজয় কাটিয়ে উঠতে পারলেও, দীর্ঘদিনের চেনা ক্ষমতা হঠাৎ হাতছাড়া হওয়াটা সহজে মেনে নিতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস এখন ঠিক তেমনই এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আইনপ্রণেতাদের এই নজিরবিহীন বিদ্রোহের পর ভারতের রাজনৈতিক মহলে এখন বড় প্রশ্ন—তৃণমূল কংগ্রেসের রাশ শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে থাকবে তো?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের রাজনীতিতে কোনো সাধারণ নেত্রী নন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি এক অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। তাঁর এই রাজনৈতিক ক্যারিশমার কারণে মার্কিন সাময়িকী ‘টাইম’ একসময় তাঁকে বিশ্বের শীর্ষ ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান দিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি তাঁর সেই শক্তিশালী অবস্থানের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। তৃণমূলের এই আকস্মিক বিদ্রোহ জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। গুঞ্জন উঠেছে, কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি জোট তথা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) আগামী জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনে আবারও বহুল আলোচিত ‘সীমানা নির্ধারণ বিল’ উত্থাপন করতে পারে। এই বিলের মাধ্যমে ২০১১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে নতুন নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। গত এপ্রিলে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের অভাবে বিলটি লোকসভায় পাস করানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানেও লোকসভায় এনডিএর একক দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তবে তৃণমূলের বিদ্রোহী আইনপ্রণেতারা যেভাবে পর্দার আড়ালে বিজেপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, তাতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা—আসন্ন অধিবেশনে এই বিল পাসের ক্ষেত্রে বিদ্রোহীরা বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
এদিকে, মমতার অনুগত শিবিরের সঙ্গে বিদ্রোহী আইনপ্রণেতাদের বাকযুদ্ধ এখন তুঙ্গে। গতকাল মমতা অনুগত প্রবীণ নেতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্রোহীদের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘ওদের নেতা এখন পাল্টে গিয়েছে। ওদের নতুন নেতার নাম নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু সরাসরি বলতে পারছে না যে ওরা বিজেপি করে।’ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কড়া মন্তব্যের জবাবে বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম শীর্ষ আইনপ্রণেতা কাকলি ঘোষ দস্তিদার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমি শুরু থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিলাম। ২০০১ সালে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে কাউন্সিলর হিসেবে লড়াই করেছি। আমি একটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছি। আমার মাথা কাটা যেতে পারে, কিন্তু আমি অন্যায়কারীদের কাছে মাথা নত করব না। অনেক সহ্য করেছি, এখন এ ধরনের লোকদের কথায় আমার কিছুই যায়-আসে না।’
দলের এই ভাঙন ও অস্থিরতার মধ্যেই গতকাল কলকাতার ৩০বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অবস্থিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি ও তৃণমূলের প্রধান কার্যালয়ে এক নাটকীয় তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে ভারতের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বিধানসভায় জমা পড়া একটি চিঠির স্বাক্ষর জালিয়াতি মামলার সূত্র ধরে সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে সিআইডি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী সেখানে হাজির হয়। ওই চিঠিতে ৭০ জন আইনপ্রণেতার স্বাক্ষর জাল করে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করার অভিযোগ রয়েছে। তল্লাশির শুরুতে মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে থাকায় তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ শুভাশিস চক্রবর্তী সিআইডিকে বাধা দিলেও, পরবর্তীতে বিকেল ৪টার দিকে তদন্ত কর্মকর্তারা ভেতরে প্রবেশ করে তল্লাশি চালান। এই ঘটনা মমতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এক নতুন সংকট তৈরি করেছে।