২০১৪ সালে জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ব্রাজিলের মাঠে। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হারিয়ে চতুর্থবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা। অথচ ওইবার হেক্সা বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ মিশন শেষ করার দৌড়ে বেশ এগিয়ে ছিল ব্রাজিল। কিন্তু ৮ জুলাই বেলো হরিজন্তের মিনেইরো স্টেডিয়ামে এক অবিশ্বাস্য ধস দেখেছিল সেলেসাওরা। মাঠেই নেইমার-থিয়াগো সিলভারা কান্নায় বুক ভাসিয়েছিলেন। ৭-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হার দেখেছিল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
ওই ট্র্যাজেডির শিকার হওয়ার পর ব্রাজিলের হেক্সার স্বপ্ন এখনো অসম্পূর্ণ থেকেছে। প্রায় এক যুগ বা ১২ বছর আগের সেই অবিশ্বাস্য জয়ের পর জার্মানিও পরের দুটি আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে। গতকাল জার্মানি সেই পুরোনো চেহারা দেখাল অভিষিক্ত কুরাসাওয়ের বিপক্ষে। সেই ৭-১ গোলেই জিতেছে তারা। তাতে ব্রাজিলের সেই বিপর্যয়ের স্মৃতি ফেরাল চারবারের চ্যাম্পিয়নরা। মিনেইরোতে ব্রাজিলকে নাকানিচুবানি খাওয়ানো ম্যাচে মাঠে নামা ১৪ জনের মধ্যে এদিন ছিলেন কেবল গোলকিপার ম্যানুয়েল ন্যয়ার। অন্যরা দীর্ঘ এক যুগে ফুটবলের নানা পথ পেরিয়ে এখন জীবনের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে আছেন। কেউ পুরোদস্তুর অবসর নিয়েছেন, কেউ আবার ফুটবল বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ব্রাজিলের সেই দুঃস্বপ্ন উপহার দেওয়া জার্মানির খেলোয়াড়রা এখন কে কোথায় আছেন:
১. ম্যানুয়েল ন্যয়ার (গোলরক্ষক): এখনও সক্রিয় খেলোয়াড় হিসেবে খেলছেন। বায়ার্ন মিউনিখের গোলরক্ষক হিসেবে মাঠ মাতাচ্ছেন। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেও ক্লাব ফুটবলে এখনও তিনি অনবদ্য। সম্প্রতি অবসর ভেঙে দুই বছর পর কুরাসাওয়ের বিপক্ষে গোলপোস্ট সামাল দেন ৪০ বছর বয়সী এই কিপার।
২. ফিলিপ লাম (ডিফেন্ডার ও অধিনায়ক): ২০১৭ সালে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে সব ধরনের ফুটবল থেকে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি ফুটবল সংগঠক ও সমাজসেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত। জার্মানিতে অনুষ্ঠিত উয়েফা ইউরো ২০২৪-এর টুর্নামেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
৩. জেরোম বোয়াটেং (ডিফেন্ডার): বায়ার্ন মিউনিখ ছেড়ে যাওয়ার পর বেশ কয়েকটি ক্লাবে খেলেছেন যেমন: লিওঁ, সালের্নিতানা। বয়স বাড়ার কারণে বর্তমানে ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে আছেন এবং বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে ফ্রি-এজেন্ট বা স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে খেলছেন।
৪. ম্যাটস হামেলস (ডিফেন্ডার): বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের দীর্ঘ ক্যারিয়ার ও সফল অধ্যায় শেষে বর্তমানে তিনি ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবগুলোতে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে রক্ষণভাগ সামলাচ্ছেন।
৫. বেনেডিক্ট হ্যোভেডেস (ডিফেন্ডার): ২০২০ সালে রাশিয়ান ক্লাব লোকোমোটিভ মস্কোতে খেলার পর সব ধরনের ফুটবল থেকে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি জার্মানি জাতীয় ফুটবল দলের ম্যানেজমেন্ট এবং বিভিন্ন ফুটবল বিষয়ক বিশ্লেষণে কাজ করছেন।
৬. সামি খেদিরা (মিডফিল্ডার): মিনেইরোতে গোল করা খেদিরা ২০২১ সালে হের্থা বার্লিনের হয়ে খেলার পর ফুটবলকে বিদায় জানান। অবসর গ্রহণের পর তিনি ফুটবল পণ্ডিত বা ভাষ্যকার হিসেবে বিভিন্ন নামী স্পোর্টস চ্যানেলে কাজ করছেন।
৭. বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার (মিডফিল্ডার): বায়ার্ন ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পাঠ চুকিয়ে ২০১৯ সালে আমেরিকান ক্লাব শিকাগো ফায়ারের হয়ে অবসর নেন। বর্তমানে তিনি জার্মানির জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল এআরডি-এর ফুটবল বিশেষজ্ঞ ও প্রধান ম্যাচ বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন।
৮. টনি ক্রুস (মিডফিল্ডার): সেই ম্যাচের জোড়া গোলদাতা ছিলেন। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে কিংবদন্তিতুল্য ক্যারিয়ারের পর ২০২৪ সালের উয়েফা ইউরোর শেষেই সব ধরনের ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি নিজের ফুটবল একাডেমি পরিচালনা এবং ব্যক্তিগত পডকাস্ট নিয়ে ব্যস্ত আছেন।
৯. মেসুত ওজিল (অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার): আর্সেনাল ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক এই তারকা ২০২৩ সালের মার্চ মাসে তুরস্কের ক্লাব বাসাকশেহিরের হয়ে খেলার পর ফুটবল থেকে অবসর ঘোষণা করেন। বর্তমানে তিনি লাইমলাইট থেকে দূরে নিজের ফিটনেস ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন।
১০. থমাস মুলার (ফরোয়ার্ড): ব্রাজিলের জালে প্রথম বল ঠেলে দেন। তিনি এখনও ফুটবলের মাঠে সক্রিয়। বায়ার্ন মিউনিখের ঘরের ছেলে হয়ে এখনও ক্লাব ফুটবলে নিয়মিত খেলছেন, তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে তিনি ইতিমধ্যেই বিদায় জানিয়েছেন।
১১. মিরোস্লাভ ক্লোসা (স্ট্রাইকার): মিনেইরোতে দ্বিতীয় গোল করেছিলেন। বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডধারী এই স্ট্রাইকার ২০১৬ সালে লাৎসিওর হয়ে খেলার পর বুট জোড়া তুলে রাখেন। এরপর তিনি কোচিং পেশায় যুক্ত হন। বায়ার্ন মিউনিখের সহকারী কোচ এবং অলটাকের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে বিভিন্ন ক্লাবের কোচিং প্যানেলের সাথে যুক্ত আছেন।
১২. আন্দ্রে শুরলে (ফরোয়ার্ড): বদলি নেমে জোড়া গোল করেছিলেন। মাত্র ২৯ বছর বয়সে ২০২০ সালে ফুটবল থেকে অকাল অবসর নিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন। বর্তমানে শারীরিক সহনশীলতা বৃদ্ধি, পর্বত আরোহণ এবং সুস্থতা বিষয়ক বিভিন্ন প্রজেক্টের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন।
১৩. পার মের্টেসাকার (ডিফেন্ডার): ২০১৮ সালেই মাঠ থেকে বিদায় নেওয়া মের্টেসাকার বর্তমানে তরুণ ফুটবলারদের উন্নয়ন ও ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন।
১৪. জুলিয়ান ড্রাক্সলার (ফরোয়ার্ড): জার্মানির পেশাদার ফুটবলার জুলিয়ান ড্রাক্সলার বর্তমানে কাতারের দোহাভিত্তিক ক্লাব আল আহলিতে খেলছেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেই থেকে কাতারের এই ক্লাবে যোগ দেন এবং বর্তমানে কাতার স্টার্স লিগে একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা উইঙ্গার হিসেবে খেলছেন।