ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ও কিংবদন্তি লোককাহিনী ‘রবিন হুড’-এর স্মৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত ওক গাছ ‘মেজর ওক’ অবশেষে মারা গেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং লোকগাথার জীবন্ত অংশ হয়ে টিকে থাকা এই বিশাল গাছটিতে চলতি মরসুমে আর কোনো নতুন সবুজ পাতা মেলেনি। ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামশায়ারের বিখ্যাত শেরউড অরণ্যের ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই মেজর ওক গাছটির বয়স আনুমানিক ৮০০ থেকে ১,২০০ বছর বলে ধারণা করা হতো। বনাঞ্চলটির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘আরএসপিবি’ (রাজকীয় পাখি সংরক্ষণ সোসাইটি) আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, চলতি বসন্তকালে গাছটিতে কোনো নতুন পাতা বা কুঁড়ি না গজানোয় এটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে।
সংস্থাটির পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, মূলত বার্ধক্যজনিত কারণে দীর্ঘদিন ধরেই গাছটি ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং শেরউড বনে আসা বিপুলসংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যটকের অনিয়ন্ত্রিত পদচারণায় গাছের চারপাশের মাটির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়। মাটির এই অতিরিক্ত ঘনত্বের কারণে শিকড় দিয়ে পুষ্টি ও পানি শোষণ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় গাছটির স্বাস্থ্য ও আয়ু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন ‘উডল্যান্ড ট্রাস্ট’—যারা ২০১৪ সালে এই মেজর ওক-কে ইংল্যান্ডের ‘বর্ষসেরা বৃক্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল, তারাও জানিয়েছে যে অতিরিক্ত পর্যটন ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতাই এই প্রাচীন গাছটির মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
উডল্যান্ড ট্রাস্টের জ্যেষ্ঠ সংরক্ষণ উপদেষ্টা এড পাইন গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “মেজর ওকের এই আকস্মিক মৃত্যু বিশ্বজুড়ে আমাদের মতো প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। আজ আমরা যেভাবে পৃথিবীর প্রাচীন গাছগুলোর যত্ন নিচ্ছি বা অবহেলা করছি, তাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সেগুলোকে আর কখনো সশরীরে টিকে থাকতে দেখবে কি না, তা নিয়ে বড় সংশয় রয়েছে।” ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এই গাছটি নরম্যান বিজয়ের (১০৬৬ খ্রিস্টাব্দ) সময়কাল থেকে শেরউড বনে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে ছিল বলে ধারণা করা হয়। একসময় দর্শনার্থীরা গাছটির একেবারে কাছে যেতে পারতেন, এমনকি এর বিশাল ফাঁপা কাণ্ডের ভেতরেও রোমাঞ্চকর প্রবেশ করতেন। তবে ১৯৭০-এর দশকে গাছটির সুরক্ষায় চারপাশে শক্ত বেড়া নির্মাণ করা হয় এবং এরপর থেকে দূর থেকে এটি দেখার ব্যবস্থা রাখা হয়।
আরএসপিবির স্থানীয় সাইট ব্যবস্থাপক হলি ড্রেক গাছটির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “মেজর ওকের ডালে আর কোনো নতুন সবুজ পাতা না আসাটা সত্যিই আমাদের জন্য হৃদয়বিদারক। তবে রবিন হুড ও শেরউড অরণ্যের কালজয়ী ইতিহাসের সঙ্গে এর যে অবিচ্ছেদ্য ও চিরন্তন সম্পর্ক রয়েছে, তার কারণে এটি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “যদিও গাছটি জৈবিকভাবে আর জীবিত নেই, তবুও এর বিশাল অবয়বটি ভবিষ্যতেও বন্যপ্রাণী ও পাখিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসেবে কাজ করবে। এটি আমাদের সবসময় মনে করিয়ে দেবে কেন এ ধরনের অসাধারণ প্রাচীন গাছ টিকিয়ে রাখা জরুরি।” তবে স্বস্তির বিষয় হলো, গাছটি সশরীরে মারা গেলেও এর ঐতিহ্য পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে না। ল্যাবরেটরিতে মেজর ওকের বীজ ও ডাল থেকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ক্লোন করে নতুন চারা উৎপাদন করা হয়েছে এবং সেসব চারা ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে রোপণ করা হয়েছে। ফলে ইতিহাসখ্যাত এই বৃক্ষের স্মৃতি ও জিনগত উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের কাছেও অনন্তকাল বেঁচে থাকবে।