চলমান সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে একটি যুগান্তকারী ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন করেছে চিরবৈরী দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করা এই বিশেষ চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর মুহূর্ত থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন হোয়াইট হাউসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘বিবিসি’ দুই পরাশক্তির মধ্যকার এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত ১৪ দফা চুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে। ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেইনসে জমকালো আয়োজনে চলমান শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত স্বস্তির খবর হলো, এই চুক্তির সরাসরি সুফল হিসেবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটিয়ে আবারও সব দেশের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। মূলত এটি একটি বিশেষ দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক, যেখানে দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা ধারণ করবে না এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির ‘পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠন করা হবে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এটিই প্রথম এবং সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য এই চুক্তিকে ‘পারফরম্যান্স-ভিত্তিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার অর্থ হলো ইরান মাঠপর্যায়ে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি সঠিকভাবে রক্ষা করলেই কেবল চুক্তির ঘোষিত সব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা ধাপে ধাপে লাভ করবে।
ঐতিহাসিক এই সমঝোতা চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের নিজ নিজ আঞ্চলিক মিত্ররা লেবাননসহ ‘সব ফ্রন্টে’ চলমান সব ধরনের সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করবে। উল্লেখ্য, আঞ্চলিক মিত্র হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র সামরিক অভিযান এই শান্তি চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও, লেবাননকেও এই যুদ্ধবিরতির আওতায় রাখার জন্য শুরু থেকেই ওল্ড টেস্টামেন্টের মতো কড়া দাবি জানিয়ে আসছিল তেহরান। চুক্তির দ্বিতীয় প্রধান শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাবে এবং কোনো পক্ষই একে অপরের অভ্যন্তরীণ শাসনতান্ত্রিক বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না।
এই শর্তটি স্বাভাবিকভাবেই ইরানের বর্তমান সরকারবিরোধী দলগুলোর জন্য একটি বড় ধাক্কা বা নেতিবাচক সংবাদ হতে পারে, কারণ এর আগে ট্রাম্প ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীদের প্রকাশ্য সাহায্য করার বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই সমঝোতায় আরও বলা হয়েছে যে, আগামী ৬০ দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে উভয় দেশ একটি চূড়ান্ত এবং স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে মূল আলোচনা চালিয়ে যাবে, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময়সীমা পরবর্তীতে আরও বাড়ানো যেতে পারে। হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, বুধবার রাতে ফ্রান্সের জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের বিশেষ নৈশভোজের পরেই ট্রাম্প এই চুক্তিতে সই করেন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও তেহরান থেকে এতে চূড়ান্ত স্বাক্ষর প্রদান করেছেন।
চুক্তির অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে, স্বাক্ষর হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে ইরানের বাণিজ্যিক বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের দীর্ঘদিনের কঠোর নৌ-অবরোধ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার শুরু করবে এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। এর বিনিময়ে ইরানও হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেবে, যেখানে নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো ধরনের বাড়তি মাশুল বা ফি নেওয়া হবে না। একই সাথে মাইন অপসারণ এবং সামরিক বাধা দূর করার পর অবিলম্বে এই জলপথে জাহাজ চলাচল শুরু হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ওমান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে মিলে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক চুক্তি করবে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আশপাশের কৌশলগত এলাকা থেকে তাদের সামরিক বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেবে। ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, এই বিশেষ তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো অর্থ প্রদান না করলেও তারা আন্তর্জাতিক অর্থ ছাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও আইনি অনুমতি দেবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবসহ সব ধরনের একতরফা কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছে, তবে এটি এখনই এককভাবে কার্যকর করা হবে না বরং চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনার অগ্রগতির মাধ্যমে ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হবে। এর জবাবে তেহরান কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত হয়েছে এবং বর্তমানে ইরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সরাসরি তত্ত্বাবধানে ধ্বংস বা এর মান কমিয়ে আন্তর্জাতিক বেসামরিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হবে। ট্রাম্প বলেছেন, তাদের এই সামরিক অভিযানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যই ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকার থেকে চিরতরে দূরে রাখা।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা কঠোরভাবে বজায় রাখবে এবং এর বিনিময়ে ইরানের ওপর নতুন করে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেবে না ওয়াশিংটন, এমনকি বিশ্ববাজারে ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈশ্বিক ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কিছু বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে। একই সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকেই বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের বিপুল অর্থ ছাড় দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র, যা মূলত ইরানের ইতিবাচক আচরণের ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে হস্তান্তর করা হবে। এই সমগ্ৰ চুক্তিটি ঠিকমতো বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা কঠোরভাবে তদারকির জন্য একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক কমিশন বা ব্যবস্থা থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত এটিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা দেওয়া হবে।