ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান

সমীকরণের মহানাটকীয়তা শেষে বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ যারা


  • আপলোড সময় : রবিবার ২৮ জুন, ২০২৬ সময় : ৪:২৮ পিএম

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং জাঁকজমকপূর্ণ মহোৎসবের প্রথম পর্বের উত্তেজনাপূর্ণ যবনিকা সম্পন্ন হয়েছে। কোটি ফুটবল ভক্তের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিশ্বমঞ্চে চূড়ান্ত হয়ে গেল নকআউট পর্বের ৩২টি শক্তিশালী দল। গ্রুপ পর্বের শেষ মুহূর্তের সমীকরণ মেলানোর জন্য কেবল চারটি স্লট বা স্থান বাকি ছিল। শনিবার দিবাগত গভীর রাত থেকে শুরু করে আজ রোববার সকাল পর্যন্ত মাঠের লড়াইয়ে অবশিষ্ট তিন-তিনটি গ্রুপের অত্যন্ত রোমাঞ্চকর খেলা সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে গ্রুপ পর্বের সকল জটিল সমীকরণের অবসান ঘটে। এর ফলে ফিফার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেকর্ডসংখ্যক মোট ৪৮টি দল নিয়ে শুরু হওয়া ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এই মেগা ইভেন্টটি এখন পরিণত হলো ৩২টি দলের মধ্যকার সরাসরি বিদায় বা নকআউট প্রতিযোগিতায়।

মাঠের এই তীব্র লড়াইয়ের সাথে সাথেই ইতোমধ্যে বিদায় নিশ্চিত হওয়া দলগুলোর পাশাপাশি নকআউটে কে কার মুখোমুখি হচ্ছে, সেই হাইভোল্টেজ প্রতিপক্ষও সম্পূর্ণ চূড়ান্ত হয়ে গেছে। গ্রুপ পর্বের শেষভাগের রোমাঞ্চের শুরুটা হয়েছিল মূলত ‘এল’ গ্রুপের নকআউটের টিকিট নির্ধারণী জটিল হিসাব-নিকাশের মধ্য দিয়ে। এই গ্রুপে নিজেদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শেষ ম্যাচে মাঠে নামার অনেক আগেই শক্তিশালী ইংল্যান্ড দল অন্তত ন্যূনতম সেরা তৃতীয় দল হিসেবে শেষ ৩২-এর টিকিট নিজেদের পকেটে পুরে রেখেছিল। ফলে গতকাল দিবাগত রাতে মাঠের লড়াইয়ে নামার সময় থ্রি লায়নসদের ওপর বাড়তি কোনো মানসিক চাপ ছিল না। এই স্বস্তির ম্যাচে তারা ইতিমধ্যে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়া আমেরিকার দল পানামার মুখোমুখি হয় এবং লড়াকু ফুটবল খেলে ২-০ গোলের এক চমৎকার জয় তুলে নেয়। ইংল্যান্ডের এই সহজ জয়ে মাঠ কাঁপিয়ে গোল দুটি করেন বর্তমান ফুটবলের দুই অন্যতম মহাতারকা জুড বেলিংহ্যাম এবং অধিনায়ক হ্যারি কেইন। একই সময়ে এবং একই গ্রুপ থেকে নকআউটের টিকিট কাটার মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাঠে নেমেছিল অপর দুই শক্তিশালী দল ক্রোয়েশিয়া ও ঘানা। এই ম্যাচের আগে আফ্রিকার পরাশক্তি ঘানা ইতিমধ্যে এক জয় এবং এক ড্রয়ের সুবাদে গুরুত্বপূর্ণ ৪ পয়েন্ট ঝুলিতে পুরে বেশ স্বস্তিতেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে রেখেছিল। তবে নকআউটের চূড়ান্ত টিকিট নিশ্চিত করার জন্য বাঁচা-মরার এক চরম কঠিন অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল কিংবদন্তি ফুটবলার লুকা মদ্রিচের দল ক্রোয়েশিয়া।

মাঠে নেমে ক্রোয়াটরা তাদের চেনা ছন্দ ফিরে পায় এবং ঘানাকে ২-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে টেবিলের দোলাচল দূর করে। ঘানার বিরুদ্ধে এই স্বস্তির জয়ের ফলে গ্রুপের পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় স্থানটি নিজেদের করে নিয়ে ক্রোয়াটরা অত্যন্ত বীরত্বের সাথে শেষ ৩২–এর মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে পা রেখেছে। গ্রুপ পর্ব শেষে এই গ্রুপের চূড়ান্ত পয়েন্ট তালিকায় দেখা যায়, সর্বোচ্চ ৭ পয়েন্ট অর্জন করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে ইংল্যান্ড। অন্যদিকে ৬ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দ্বিতীয় দল হিসেবে নকআউটে গেছে ক্রোয়েশিয়া এবং ঘানা ৪ পয়েন্ট নিয়ে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট কাটতে সক্ষম হয়েছে। ঠিক এর প্রায় আধঘণ্টা পর ফুটবল ভক্তদের চোখ চলে যায় ‘কে’ গ্রুপের চার দলের মাঠের মধ্যকার ফুটবল যুদ্ধ দেখার জন্য।

এই গ্রুপে ফুটবল বিশ্বের দুই বড় পরাশক্তি কলম্বিয়া ও পর্তুগাল নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচ থেকেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আগেই নকআউট পর্বের খেলা নিশ্চিত করে রেখেছিল। ফলে গ্রুপ পর্বের এই হাইভোল্টেজ শেষ ম্যাচটিতে দুই বিশ্বসেরা দল মূলত মুখোমুখি হয়েছিল নিজেদের গ্রুপের শীর্ষ পজিশন বা চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে নকআউটে যাওয়ার রাজকীয় লড়াইয়ে। ফুটবলপ্রেমীদের বুঁদ করে রাখা দুই দলের এই তুমুল রোমাঞ্চকর এবং হাড্ডাহাড্ডি দ্বৈরথে আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণ হলেও শেষ পর্যন্ত কেউই প্রতিপক্ষের জাল খুঁজে পায়নি। ফলে গোলশূন্য সমতায় ম্যাচটি শেষ হওয়ার পর পয়েন্ট টেবিলের মোট ৭ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে কলম্বিয়া ‘কে’ গ্রুপের অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে মাথা উঁচু করে মাঠ ছাড়ে। অন্যদিকে সমান তালে লড়াই করা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল ৫ পয়েন্ট অর্জন করে রানার্সআপ দল হিসেবে পরবর্তী রাউন্ডে পা রাখে।

ঠিক এই গ্রুপ থেকেই একই সময়ে অন্য একটি মাঠে উজবেকিস্তানকে ২-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে তৃতীয় দল হিসেবে রূপকথার মতো এক অভাবনীয় ইতিহাস গড়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউটে জায়গা করে নেয় আফ্রিকার লড়াকু দল গণতান্ত্রিক কঙ্গো। ‘কে’ গ্রুপের এই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচগুলো শেষ হওয়ার পর কোটি ফুটবল ভক্তের চোখ আটকে যায় ‘জে’ গ্রুপের দিকে। কারণ বিশ্বমঞ্চের নকআউটে ওঠার জন্য তখন কেবল আর মাত্র দুটি দলের আসন ফাঁকা অবশিষ্ট ছিল। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে সবার তীব্র নজর ছিল ইতিমধ্যে নিজেদের গ্রুপ পর্বের সবকটি ম্যাচ শেষ করে অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের ফুটবল পরাশক্তি ইরানের ভাগ্যের দিকে। আলজেরিয়া বনাম অস্ট্রিয়ার মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচটিতে যেকোনো একটি দল জয়লাভ করলেই কপাল খুলে যেত ইরানের এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি সরাসরি নকআউটে খেলার টিকিট পেয়ে যেত।


কিন্তু ইরানকে চরম হতাশার সাগরে ডুবিয়ে এবং তাদের ফুটবল সমর্থকদের কাঁদিয়ে মাঠের সেই রোমাঞ্চকর ফুটবল ম্যাচটি ৩-৩ গোলের এক মহানাটকীয় ড্রয়ে শেষ হয়। এই ড্রয়ের ফলে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া উভয়েই সমান ৪ পয়েন্ট অর্জন করে এবং গোল ব্যবধানের দারুণ সমীকরণে দুই দলই একসাথে নকআউটের টিকিট নিশ্চিত করে ফেলে। একই গ্রুপ থেকে অবশ্য আগেই দাপটের সাথে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত করে রাখা লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি আর্জেন্টিনা তাদের শেষ গ্রুপ ম্যাচে জর্ডানকে ৩-১ গোলের বড় ব্যবধানে অনায়াসে পরাজিত করে। যদিও এই ম্যাচটির ফলাফলে কোনো দলের জন্যই নকআউটের সমীকরণে কোনো রকম প্রভাব পড়ার কারণ ছিল না। গ্রুপ পর্বের এই দীর্ঘ এবং রোমাঞ্চকর লড়াই শেষে শীর্ষ দুই দল এবং সেরা তৃতীয় দলের গাণিতিক হিসাবে যারা বিশ্বকাপের মূল নকআউটে জায়গা করে নিয়েছে, তারা হলো: গ্রুপ ‘এ’ থেকে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা। গ্রুপ ‘বি’ থেকে সুইজারল্যান্ড, কানাডা এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল হিসেবে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা। গ্রুপ ‘সি’ থেকে লাতিন পরাশক্তি ব্রাজিল ও মরক্কো। গ্রুপ ‘ডি’ থেকে অন্যতম স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং তৃতীয় দল হিসেবে প্যারাগুয়ে। গ্রুপ ‘ই’ থেকে ইউরোপের পরাশক্তি জার্মানি, আইভরি কোস্ট এবং তৃতীয় দল হিসেবে ইকুয়েডর। গ্রুপ ‘এফ’ থেকে নেদারল্যান্ডস, জাপান এবং তৃতীয় দল হিসেবে ইউরোপের সুইডেন। গ্রুপ ‘জি’ থেকে রেড ডেভিলস বেলজিয়াম ও মিসর। গ্রুপ ‘এইচ’ থেকে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও চমক দেখানো কেপ ভার্দে।

গ্রুপ ‘আই’ থেকে সাবেক চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, নরওয়ে এবং তৃতীয় দল হিসেবে আফ্রিকার দেশ সেনেগাল। গ্রুপ ‘জে’ থেকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া এবং তৃতীয় দল হিসেবে আলজেরিয়া। গ্রুপ ‘কে’ থেকে দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া, পর্তুগাল এবং প্রথমবার ইতিহাস গড়া গণতান্ত্রিক কঙ্গো। এবং সর্বশেষ গ্রুপ ‘এল’ থেকে ফুটবল পরাশক্তি ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া ও ঘানা। ফুটবল বিশ্বের এই পরম আনন্দের মহোৎসবের বিপরীতে তৈরি হয়েছে এক চরম বিষাদের আবহ। মাঠের পারফরম্যান্সের কঠিন লড়াইয়ে টিকতে না পেরে গ্রুপ পর্বের চরম বৈতরণী পার হওয়ার আগেই বিশ্বমঞ্চ থেকে অনেক বড় বড় নামসহ বিদায়ঘণ্টা বেজে গেছে মোট ১৬টি দেশের।

কোটি ভক্তের বুকভাঙা কান্না আর রাশি রাশি হতাশা সঙ্গী করে গ্রুপ পর্ব থেকেই এবারের আসরের বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে বাড়ির বিমান ধরতে হচ্ছে চেক প্রজাতন্ত্র, কাতার, হাইতি, তুরস্ক, কুরাসাও, তিউনিসিয়া, নিউজিল্যান্ড, উরুগুয়ে, সৌদি আরব, ইরাক, জর্ডান, পানামা, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, স্কটল্যান্ড এবং উজবেকিস্তানের মতো পরিচিত সব ফুটবল দলকে। গ্রুপ পর্বের এই টানটান উত্তেজনার সমাপ্তির সাথে সাথেই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আগামী দিনগুলোতে মাঠের লড়াইয়ের তীব্রতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

কেননা নকআউটের প্রতিটি ম্যাচই এখন দলগুলোর জন্য একেকটি ফাইনাল পরীক্ষা, যেখানে একটিমাত্র ভুল বা পরাজয় মানেই বিশ্বজয়ের স্বপ্ন থেকে চিরতরে ছিটকে পড়া। ফুটবল বিশ্বের সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এখন পুরো দুনিয়ার নজর কেবলই এই ঐতিহ্যবাহী ৩২ দলের মধ্যকার বিশ্বসেরা হওয়ার চূড়ান্ত রাজকীয় মহালড়াইয়ের দিকে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর