ভারত ও তার সীমান্তবর্তী রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে টানা কয়েকদিন ধরে চলা অবিরাম ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে আসামে তীব্র ও ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বন্যার প্রথম ঢেউয়ের আঘাতেই রাজ্যের অন্তত ছয়টি নিচু জেলায় ২২ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। গতকাল রবিবার (২৮ জুন) রাজ্যের সংশ্লিষ্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, আকস্মিক ও অবিরাম বর্ষণে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্র নদসহ এর সব উপনদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আশঙ্কাজনক রূপ নিচ্ছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও বেশি উদ্বেগজনক করে তুলছে। আসাম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, ধেমাজি, নলবাড়ি, ডিব্রুগড়, চিরাং, লখিমপুর ও কোকড়াঝাড় জেলায় মোট ২২,১২৪ জন মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছেন। এর মধ্যে ধেমাজি জেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে শোচনীয় আকার ধারণ করেছে, যেখানে এক জেলাতেই ১৫,৪৮৩ জন বাসিন্দা বর্তমানে ক্রমবর্ধমান পানির কারণে চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন।
সরকারি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বন্যার তীব্র স্রোতে ইতোমধ্যে ৯৬টি গ্রাম সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং প্রায় ১,৬৯০ হেক্টর ফসলি জমি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে, যা স্থানীয় কৃষকদের বড় লোকসানের মুখে ফেলেছে। এ ছাড়া মানুষের পাশাপাশি প্রায় ৪৮,১৯৯টি গবাদি পশু ও গৃহপালিত প্রাণী এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিবসাগর জেলার নাঙ্গলামুরাঘাটে দিসাং নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ভারী বর্ষণ ও বন্যার ভয়াবহতার কারণে ধেমাজি জেলায় শিমেন নদীর ওপর নির্মিত একটি ঐতিহাসিক রেলসেতু আংশিক ধসে পড়েছে বলে নিশ্চিত করেছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে (এনএফআর)। নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা (সিপিআরও) জানান, ধেমাজি ও তার আশেপাশের অঞ্চলে ১১০ মিলিমিটারের বেশি রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর ফলে সৃষ্ট তীব্র বন্যা ও নদী ভাঙনের কারণে আর্চিপাথার এবং সিমন চাপারি স্টেশনের মধ্যবর্তী অংশে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, ১৯৬৫ সালে নির্মিত এই সেতুটি গতকাল পর্যন্ত বেশ ভালো ও নিরাপদ অবস্থায় ছিল। কিন্তু ভারী বর্ষায় নদীর পাড়ের একটি বড় অংশ ধসে যাওয়ায় সেতুর একটি মূল পিলার বা স্তম্ভ নিজের ভারসাম্য হারিয়ে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। তবে এটি একটি কম যান চলাচলকারী শাখা লাইন ছিল এবং নদীতে প্রবল বন্যার কারণে আগেই সুরক্ষার্থে সমস্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, ফলে কোনো ট্রেনের ক্ষতি হয়নি বা কোনো ব্যক্তি হতাহত হননি।
তিনসুকিয়া বিভাগের অন্তর্গত মুরকংসেলেক ও সিলাপাধারের মধ্যে ট্রেন চলাচল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ স্থগিত থাকবে। আপাতত এই রুটের ট্রেনগুলো সিলাপাথারে যাত্রা শেষ করবে এবং সেখান থেকেই আবার ফিরতি যাত্রা শুরু করবে। যেসব যাত্রী মুরকংসেলেক থেকে সিলাপাধারে যেতে চান, তাদের সুবিধার্থে রেলওয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ বাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যাত্রীদের সব ধরনের প্রয়োজনীয় তথ্য ও জরুরি সহায়তা প্রদানের জন্য ধেমাজি, সিলাপাথার ও মুরকংসেলেক স্টেশনে ইতোমধ্যে বিশেষ হেল্প ডেস্ক খোলা হয়েছে। বর্তমানে জেলা ও রাজ্য সরকারি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।